আগামী সপ্তাহে আসছে ‘মায়াকুমারী’
নতুন ছবির মুক্তি হোক বা নির্মাণ। পোস্টার, ট্রেলার রিলিজ। ছবি হিট এবং ফ্লপ। তারকাদের জীবনের ওঠাপড়া। বাংলা ও হিন্দি মিলিয়ে সিনেমার দুনিয়ায় প্রতি মুহূর্তে ঘটে চলেছে নানা বৈচিত্রপূর্ণ ঘটনা। সেইসবই এই বিভাগে, প্রতি সপ্তাহে। আগামী সপ্তাহে মুক্তি পাচ্ছে অরিন্দম শীল পরিচালিত ‘মায়াকুমারী’। লিখেছেন সোমনাথ লাহা।
বাংলা সিনেমার শতবর্ষ পূর্তির কথা মাথায় রেখে পরিচালক অরিন্দম শীলের ছবি ‘মায়াকুমারী’। আগামী সপ্তাহেই মুক্তি পাচ্ছে এই ছবি। ছবির প্রেক্ষাপট ১৯৪০ থেকে ২০১৮। অর্থাৎ বাংলা ছবি যখন নির্বাক থেকে সবাক যুগে যাত্রা শুরু করেছে, সেই সময়কাল থেকে বাংলা সিনেমার একশো বছর ধরে চলা যাত্রাপথের ঐতিহ্যকে ফিরে দেখেছেন পরিচালক। তবে ইতিহাসের ছোঁয়া থাকলেও এই ছবি নিছক তথ্যকেন্দ্রিক নয়, এতে আছে হাই-ভোল্টেজ ড্রামা। রোম্যান্সের আবহে মোড়া এই ছবির ভরকেন্দ্রে রয়েছেন চারের দশকের নায়ক-নায়িকা মায়াকুমারী ও কাননকুমার।
ছবিতে মায়াকুমারীর চরিত্রে রয়েছেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। অরিন্দমের পরিচালনায় এই প্রথমবার কাজ করেছেন তিনি। প্রসঙ্গত, ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁরা দীর্ঘদিনের বন্ধু। অরিন্দমের পরিচালনায় কাজ করা প্রসঙ্গে স্বভাবতই উচ্ছ্বসিত ঋতুপর্ণা ছবির প্রচার উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, “অনেক আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশা রয়েছে এই ছবিকে ঘিরে। ছবিতে মায়াকুমারীকে ঘিরে যে রহস্য লুকিয়ে আছে তা উন্মোচিত হবে প্রেক্ষাগৃহে। প্রথমবার অরিন্দম আর আমি একসঙ্গে, তাই ছবিটা হিট হতেই হবে।” ছবিতে কাননকুমার ও তাঁর নাতি আহির এই দ্বৈত ভূমিকায় অভিনয় করেছেন আবির চট্টোপাধ্যায়। এছাড়াও ছবিতে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন রজতাভ দত্ত। ছবিতে তাঁকে দেখা যাবে একজন সংগীত পরিচালকের ভূমিকায়। অন্যান্য চরিত্রে রয়েছেন অরুণিমা ঘোষ, ইন্দ্রাশিস রায়, অর্ণ মুখোপাধ্যায়, অম্বরীশ ভট্টাচার্য, সৌরসেনী মৈত্র, ফলক রশিদ রায়, অসীম রায়চৌধুরী, জয়দীপ কুন্ডু প্রমুখ।


দেবলীনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা একটি কাহিনি থেকেই এই ছবির ধারণা পেয়েছিলেন অরিন্দম। পরিচালকের সেই ভাবনাকে, তাঁর সঙ্গে মিলে গল্পের আকার দিয়েছেন শুভেন্দু দাশমুন্সি। পিরিয়ড পিস এই ছবির চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন শুভেন্দু দাশমুন্সি ও পরিচালক স্বয়ং। ইতিপূর্বে অরিন্দমের ‘মহানন্দা’ সহ ‘গুপ্তধনের সন্ধানে’ ও ‘দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন’-এর চিত্রনাট্য লিখেছেন শুভেন্দু। আসলে ‘মায়াকুমারী’–এই নামটির মধ্যে দিয়ে পরিচালক সিনেমার অঙ্গন, তার মোহ-মায়া, কাছে-দূরের টানাপোড়েনের চিত্রপটের মধ্যে দিয়ে বাংলা ছবির বিবর্তনের নানা ধারাকে ফুটিয়ে তুলেছেন ছবির গল্পে। সেই কারণেই ছবির গল্পে দর্শক খুঁজে পাবেন বাংলা ছবির কিংবদন্তিদের।

ছবির মধ্যে ছবি–এই কাঠামোকে অনুসরণ করেই তৈরি হয়েছে ‘মায়াকুমারী’। কাহিনি আবর্তিত হয়েছে চারের দশকে বাংলা ছবির সাড়া জাগানো জুটি মায়াকুমারী ও কাননকুমারকে কেন্দ্র করে। ডাকসাইটে নায়িকা মায়াকুমারীর সঙ্গে কাজের সুবাদে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল কাননকুমারের। সেই সময় তাঁরা একসঙ্গে একের পর এক ছবিতে জুটি বেঁধে ছবি করেন। কাননকুমার শুধুমাত্র একজন অভিনেতাই নন, তিনি আবার পরিচালকও বটে। অথচ মায়াকুমারী বিবাহিতা। তিনি সংগীত পরিচালক শীতল ভট্টাচার্যর (রজতাভ) স্ত্রী। শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে নিজের স্বামীর সঙ্গে থাকতেন মায়াকুমারী। তবে, জটিলতা শুধু সেখান থেকে নয়। রয়েছে আরও কারণ। সমসাময়িক একটি ছবির দৃশ্যে চুম্বন ও খোলা পিঠ প্রদর্শনের জন্য সেই ছবির প্রিমিয়ারে নায়িকার গায়ে থুতু ছেটান এক দর্শক। পাশাপাশি মায়াকুমারীকে সমালোচনায় বিদ্ধ করে তখনকার সমাজ। কেরিয়ারের মধ্যগগনেই ছবির দুনিয়া থেকে হঠাৎ করেই দূরে চলে যান মায়াকুমারী। ব্যাথিত হয়েই কি নায়িকার ছবির জগৎ থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন? এই ছবিতে সেই রহস্যই খুঁজবে আজকের সময়ের এক পরিচালক সৌমিত্র মল্লিক (ইন্দ্রাশিস)।


সৌমিত্র মায়াকুমারী ও কাননকুমারকে নিয়ে একটি ছবি বানাচ্ছে। সেই ছবিতে মুখ্য চরিত্রে রয়েছে তরুণ অভিনেতা আহির চট্টোপাধ্যায় (আবির) ও নবাগতা অভিনেত্রী রুনি চৌধুরী (অরুণিমা ঘোষ)। ঘটনাচক্রে আহির সম্পর্কে কাননকুমারের নাতি। তাহলে কি কাননের নাতির এই ছবির শুটিংয়েই পাওয়া যাবে সেই না পাওয়া প্রশ্নের উত্তর ? আদতে সেই উত্তর মিলবে ছবির পর্দায়। ছবিতে মায়াকুমারী, শীতল ও কাননকুমারের চরিত্রের দুটি সময়কাল রয়েছে। একটি কম বয়সের, অপরটি বেশি বয়সের। সেইজন্য প্রস্থেটিক মেকআপের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। অপরদিকে আবিরের চরিত্রটিতে রয়েছে আরও একটি পরত। কারণ একাধারে কাননকুমার ও তাঁর নাতি আহির এই দুই চরিত্রেই রয়েছেন তিনি। সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে আবিরের মন্তব্য, “কঠিন বলব না। বরং নতুন চ্যালেঞ্জ ছিল। সেই প্রক্রিয়াটা আমি খুব উপভোগ করেছি।” পাশাপাশি ছবি প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “সিনেমার মাধ্যমে মানুষ স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সেই স্বপ্ন দেখানোর প্রচেষ্টাতে পর্দার আড়ালে অনেক কিছু ঘটে যায়। সেক্ষেত্রে সব সময় সব স্বপ্ন পূরণ হয় না। সেটা ‘মায়াকুমারী’ ছবির মাধ্যমেই দেখা যাবে।”

ক্যামেলিয়া প্রোডাকশনস প্রাঃ লিঃ-এর প্রযোজনায় নির্মিত এই ছবির নিবেদক রূপা দত্ত। সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে ছবির টিজার-ট্রেলার সহ অফিশিয়াল পোস্টার। ছবির ট্রেলার ইতিমধ্যেই এই ছবিকে ঘিরে উন্মাদনার পারদ চড়িয়েছে দর্শকমহলে। মিউজিক্যাল এই ছবির সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন বিক্রম ঘোষ। ছবির গানের কথা লিখেছেন শুভেন্দু দাশমুন্সি ও সুগতা গুহ। ছবিতে রয়েছে মোট ১১টি গান। লকডাউনের সময় মুক্তি পাওয়া মধুবন্তী বাগচীর গাওয়া ‘মধুমাসে ফুল ফোটে’ ইতিমধ্যেই বেশ জনপ্রিয়। প্রকাশ্যে এসেছে ছবির আরও দুটি গান–’ভালোবেসে এত জ্বালা’ গেয়েছেন ইমন চক্রবর্তী ও ‘চোখের জলে’ গেয়েছেন মনোময় ভট্টাচার্য। এছাড়াও ছবিতে প্লেব্যাক করেছেন হৈমন্তী শুক্লা, উজ্জয়িনী প্রমুখ। অনেক বছর পর এই ছবিতেই আবার প্লেব্যাক করলেন ইন্দ্রনীল সেন। ছবির মেকআপের দায়িত্ব সামলেছেন সোমনাথ কুন্ডু। ছবির সিনেমাটোগ্রাফার শুভঙ্কর ভড়। সম্পাদনায় সংলাপ ভৌমিক। পোশাক পরিকল্পনায় অভিষেক রায়।



নানা কারণে দেরির পর অবশেষে নতুন বছরেই মুক্তি পেতে চলেছে এই ছবি। অরিন্দমের কথায়, “আমি যাঁদের সঙ্গে কাজ করি, এই ছবি তাঁদের প্রতি এক ধরনের ট্রিবিউট। এই ছবির মাধ্যমে আমরা বাংলা চলচ্চিত্রের শতবর্ষ পূর্তিকে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করছি।” তবে যেহেতু এই ছবির পরিচালকের নাম অরিন্দম শীল, তাই পিরিয়ড-মিউজিক্যাল এই ছবির মাঝেও যে থ্রিলের পরত থাকবে এমনটা আশা করাই যায়। আগামী ১৩ জানুয়ারি মুক্তি পাচ্ছে ‘মায়াকুমারী’।

