কেমন আছো কাশ্মীর?
দিন যাপনের একঘেয়েমি আর ক্লান্তি দূর করতে পর্যটনের বিকল্প নেই। চার দেওয়ালের গন্ডি ছাড়িয়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে ঝোলা কাঁধে সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন যাঁরা, তাঁদের জন্যই এই কলম।
নিবিড়, নান্দনিক নিসর্গের কাশ্মীর বরাবর পর্যটন আকর্ষণের কেন্দ্রে। ভূস্বর্গ কাশ্মীর নিয়ে আমাদের যত অহংকার, তত যন্ত্রনা। স্বাধীনতার পর কেটে গেল এতগুলি বছর, বদলালো না কাশ্মীরের ভাগ্য। সুন্দর প্রকৃতির মাঝে কেমন আছেন এখানকার মানুষ ? তাঁদের যাপনও কী এমন সুন্দর ? পড়ছেন ছন্দা চট্টোপাধ্যায়ের কলমে। ধারাবাহিক রচনার দশম ও শেষ পর্ব আজ।
গত সপ্তাহে নাথাটপের কথা বলেছি। হিমালয়ের দুর্দান্ত ভিউ পেলাম এখানে। ঘন্টাখানেক নাথাটপে কাটিয়ে পাটনিটপে না থাকতে পারার দুঃখ কিছুটা দূর হলো। প্রসঙ্গত, এই পথে বহুবার সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়েছে। মেহরাজের কাছে শুনলাম বানিহালের কাছাকাছি একটা জঙ্গী হামলার সমস্যায় কিভাবে আটকা পড়ে গেছিল সে। মেহরাজ সেদিন জম্মুতে প্যাসেঞ্জার নামিয়ে ফিরে আসছিলো। ঘটনাস্থলের ১ কিমি আগে প্রায় দুদিন ওদের আটকে থাকতে হয়েছিল। সারি সারি বাস লরি, গাড়ি ঠায় দাঁড়িয়ে। খাবার নেই, জল নেই। উপদ্রুত এলাকা বলে এপথে যখন তখন পুলিশ চেকিং হয়। তবে, ওরা এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
আমরা ক্রমশ নামছি। এভাবে ঘন্টা দেড়েক চলার পরে জম্মু পৌঁছে গেলাম। তারপরে হোটেলে। পরদিন জম্মু-তাওয়াই এক্সপ্রেস ধরবো বলে আমরা রেল স্টেশনের কাছাকাছি একটা হোটেল বুক করেছিলাম। মেহরাজকে শ্রীনগর ফিরে যেতে বললাম। কিন্তু সে রাজি হলো না। বলল,পরদিন আমাদের স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে তবেই বিদায় নেবে। আমরা আমাদের হোটেলেই ওর থাকার ব্যবস্থা করে দিলাম। পরদিন সন্ধ্যায় আমাদের ট্রেন। লম্বা জার্নি। সেই কারণে সেদিন আর আমরা বেরোনোর কোনও প্রোগ্রাম রাখিনি। হোটেল পর্যন্ত আসতে আসতে এটুকু বোঝা গেল, ছিমছাম শহর জম্মু। উচ্চতা ১০৭৩ ফুট। যেদিকে তাকাই দূরে দূরে ধূসর পাহাড়শ্রেণী হাতছানি দেয়।



আমরা প্রথমবার কাশ্মীর যাই ২০১০ সালে। এরপরে অন্তত চারবার কাশ্মীর যাবার সুযোগ হয়েছে ইমরানের কথাকে সত্যি প্রমাণ করে। প্রতিবারই সফরসঙ্গী ছিল মেহরাজ। ওর সঙ্গে একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। শুনেছিলাম বাঙালিদের মত কাশ্মীরিরাও নাকি খুব আবেগপ্রবণ জাতি। সত্যিই তাই। শেষবার কাশ্মীর গেছি ২০১৬-র এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে, শুধু টিউলিপ দেখবো বলে। এতবার আসা যাওয়ার মধ্যে তেমন কোনও উন্নয়ন চোখে পড়েনি। হয়তো লাগাতার অস্থিরতা এর প্রধান কারণ। তখনও পর্যন্ত ‘জম্মু এন্ড কাশ্মীর’ বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত রাজ্য ছিল।
২০১৯ সালে যখন কেন্দ্র আর্টিকল ৩৭০ বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিল, তখন আমার মত অনেকের জানার আগ্রহ হলো, আর্টিকল ৩৭০ ধারা আসলে কি ? ১৯৪৭ সালে দেশকে দুই টুকরো করে স্বাধীনতা লাভের সময় জম্মু-কাশ্মীরে স্বাধীন রাজা হরি সিংয়ের রাজত্ব কায়েম ছিল। পাকিস্তান যখন কাশ্মীর দখল করার জন্য আক্রমণ করল, তখন রাজা হরি সিং ভারতের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানকে পরাজিত করে লাইন অফ কন্ট্রোল অবধি পিছোতে বাধ্য করার পরে মহারাজ হরি সিংয়ের ইচ্ছা এবং প্রচেষ্টায় ভারতীয় সংবিধানে শুধু ‘জম্মু এন্ড কাশ্মীর’-এর জন্য একটি ধারা যুক্ত হয়। সেটাই আর্টিকেল ৩৭০।


এই ধারা অনুযায়ী ‘জম্মু এন্ড কাশ্মীর’ বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা পাব। সরকার চালাবে অটোনমাস বডি এবং তার জন্য রাজ্যের আলাদা সংবিধান তৈরি করা হবে। রাজ্যসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কেন্দ্র পদক্ষেপ করবে। রাজ্যের জমি রাজ্যের স্বীকৃত বসবাসকারী ছাড়া বাইরের কেউ কিনতে পারবে না। অর্থাৎ উত্তরাধিকার চলতে থাকবে। কিন্তু এই ধারা ‘সাময়িক’,’পরিবর্তনশীল’ এবং ‘পরিস্থিতি’ অনুযায়ী বদলাবে–এটাও ছিল ১৯৫৪ সালে রাষ্ট্রপতি অনুমোদিত এই ধারায়। বিশেষ রাজ্যের মর্যাদার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ কোনও দিনও স্বস্তিতে থাকতে পারেনি। সীমান্তে যুদ্ধ, জঙ্গী হামলার ভয়, সাধারণ নাগরিকের ওপর সন্ত্রাসবাদী সন্দেহে সেনা অত্যাচার, পুলিশি সন্ত্রাস, জম্মু এবং কাশ্মীরকে সবসময় অশান্ত করে রেখেছে।
প্রশ্ন হলো, ২০১৯ সালে ৩৭০ ধারা বিলোপ করে, রাজ্যসভা ভেঙে জম্মু ও কাশ্মীরকে ইউনিয়ন টেরিটরি বানিয়ে সাধারণ মানুষের কোনও সুবিধা হয়েছে কি? ৩৭০ ধারা অবলুপ্ত করার জন্য যেভাবে কাশ্মীরের মানুষকে হেনস্থা করা হয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং আমানবিক। নেতা-মন্ত্রীদের গৃহবন্দী করে রাখা, জেলে পুরে দেওয়া, সংবাদপত্রের ওপরে কড়া নজরদারি, দিনের পর দিন বন্ধ দোকান বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, লাগাতার কারফিউ জারি করে রাখা, ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে বাইরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেওয়া–এসবের দরকার হলো কেন ?



আমার মনে আছে আগে আমাদের সল্টলেকে স্থানীয় মেলায় প্রচুর কাশ্মীরি স্টল বসতো একটা সময়। ৩৭০ ধারা বিলোপের পরে ২০১৯ সালে অল্প কিছু স্টল মেলায় এসেছিলো, অল্প পণ্যসামগ্রী নিয়ে । ওদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জানতে পারলাম কি সাংঘাতিক দুর্দশায় দিন কেটেছে। ব্যবসা বন্ধ, প্রোডাক্টশন বন্ধ, ঘরে বসে বসে খাবার জোগাড় করাই কঠিন। বাইরের কোনও আত্মীয়বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগের উপায় ছিল না। ওই সময়টায় মেহরাজের সঙ্গেও আমার যোগাযোগ পুরোপুরি বিছিন্ন হয়ে গেছিল। দীর্ঘদিন পরে ওর ফোন এল যেদিন, সেদিন স্বস্তি পেয়েছিলাম।

এরপরে,’কেমন আছো মেহরাজ’ যখনই প্রশ্ন করেছি–একটাই উত্তর দিয়েছে, ‘চল রহা হ্যায় ম্যাডামজী’। আপলোগ ঠিক হো ? বারবার ওখানে যাবার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে সে বলেছে, টুরিস্টদের কোনও বিপদ নেই। মেহরাজের এই স্বস্তিপ্রদান একদিকে নতুন করে আবার কাশ্মীর যাওয়ার ইচ্ছেটাকে তীব্র করে তোলে নিঃসন্দেহে। অন্যদিকে এটাও মনে মনে বলি, ভালো থাকুক মেহরাজরা। পর্যটকরাই তো ওদের লক্ষ্মী। সারা বিশ্বের পর্যটন মানচিত্রে কাশ্মীরের ভাবমূর্তি শঙ্কামুক্ত হোক। তার সৌন্দর্যের জয়গাথা নতুন করে ছড়িয়ে পড়ুক সর্বত্র।

