কেমন আছো কাশ্মীর?
দিন যাপনের একঘেয়েমি আর ক্লান্তি দূর করতে পর্যটনের বিকল্প নেই। চার দেওয়ালের গন্ডি ছাড়িয়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে ঝোলা কাঁধে সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন যাঁরা, তাঁদের জন্যই এই কলম।
নিবিড়, নান্দনিক নিসর্গের কাশ্মীর বরাবর পর্যটন আকর্ষণের কেন্দ্রে। ভূস্বর্গ কাশ্মীর নিয়ে আমাদের যত অহংকার, তত যন্ত্রনা। স্বাধীনতার পর কেটে গেল এতগুলি বছর, বদলালো না কাশ্মীরের ভাগ্য। সুন্দর প্রকৃতির মাঝে কেমন আছেন এখানকার মানুষ ? তাঁদের যাপনও কী এমন সুন্দর ? পড়ছেন ছন্দা চট্টোপাধ্যায়ের কলমে। ধারাবাহিক রচনার তৃতীয় পর্ব আজ।
ডাল লেক যদি শ্রীনগরের প্রাণভোমরা হয়, শ্রীনগরের প্রাণস্পন্দন অবশ্যই সুরুচি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরিচায়ক বিস্ময়কর বাগানগুলি। এ ব্যাপারে মুঘলদের অবদান অবিস্মরণীয়। বিশেষ উল্লেখ্য, প্রত্যেকটি উদ্যান আলাদা আলাদা সুচিন্তিত ভাবনা ও পরিকল্পনায় তৈরি করা হয়েছে। তবে, সব ক্ষেত্রে কমন ফ্যাক্টর হলো, ‘ডাল লেক’ এবং ‘চিনার গাছ’। ডাল লেককে ঘিরেই তৈরি হয়েছে বাগানগুলি। আর সেগুলিকে বৈচিত্রে অনন্যসাধারণ করে তুলেছে সারি সারি ‘চিনার’। পুরো কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে চিনার দেখা যায়। কাশ্মীরিদের কাছে ‘চিনার’ শুধু গাছ নয়–তাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে চিনার–কাশ্মীরি ঐতিহ্যর প্রতীক হয়ে। এখানে পাইন, ঝাউ, দেবদারু, সিলভার ওক ইত্যাদি গাছের চেহারাও বেশ আলাদা। কাশ্মীরের বাগানগুলো সেই কারণেও অনেক বেশি আকর্ষণীয়। পাহাড়ের ওপরেও মুঘলদের বানানো পরীমহল, চশমা শাহী বাগ এমনকি টিউলিপ গার্ডেনও এমনভাবে তৈরি, সর্বত্র দৃশ্যমান ডাল লেক, সৌন্দর্য সৃষ্টিতে অনন্য মাত্রা যোগ করেছে।
তবে, শ্রীনগর শুধু নয়, কাশ্মীর উপত্যকার বেশিরভাগ বাগানই মুঘলদের সৃষ্টি। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, নিশাতবাগ, শালিমার বাগ এবং চশমাশাহী বাগ। গতকালই আমরা চশমাশাহী বাগ ঘুরে এসেছি। আজ শালিমার বাগ আর নিশাতবাগ ঘুরে ডাল লেকে শিকারা ভ্রমণ করবো ঠিক করেছিলাম। লাঞ্চ সেরে রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে এসে কিছু বলার আগেই মেহরাজ বলল, কাছেই হজরতবাল মসজিদ, ওখানে যাবেন কি এখন ? ভাবলাম, মন্দ কী ? ওখান থেকেই নাহয় শিকারা ভ্রমণে যাওয়া যাবে।

দশ মিনিটও লাগলো না হজরতবাল গেটের কাছে পৌঁছতে। তার আগেই ডানদিকে বিশাল গেট দেখিয়ে মেহরাজ বলল, কাশ্মীর ইউনিভার্সিটি ম্যাডামজি। কাশ্মীর ইউনিভার্সিটির যথেষ্ট সুনাম শুনেছিলাম । বিশাল ক্যাম্পাসের মধ্যে কলেজ, ইউনিভার্সিটি, রিসার্চ ওয়ার্ক শুধু নয়–ডাক্তারি ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি প্রায় সব বিষয়ের পড়াশুনো হয়। ন্যাক-এর A+ গ্রেড অর্জন করেছে কাশ্মীর ইউনিভার্সিটি। কাশ্মীরে সাক্ষরতার হার যথেষ্ট উদ্বেগজনক হলেও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে জেনে ভালো লেগেছিল। হজরতবাল মসজিদের গেটের সামনে গাড়ি থেকে নামার সময় মেহরাজ মনে করিয়ে দিল, মাথা ঢেকে ভেতরে ঢুকতে হবে।
হজরতবাল মসজিদ আসলে দরগা শরীফ । বেশ কিছুদিন আগে পর্যন্ত দরগা আর মসজিদের পার্থক্য জানতাম না। চার্চ আর ক্যাথিড্রাল-এর মধ্যে যে তফাৎ, অনেকটা সেরকম। দরগা ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে শুধু প্রার্থনা করার জায়গা নয়, পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। কোনও গুরুত্বপূর্ণ সুফী সন্ত বা ধর্মগুরুর সমাধির ওপরে স্মৃতিফলক বা স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয় দরগায়। দরগার ভেতরে নমাজ পড়ার জন্য মসজিদ থাকে, ধর্মীয় সম্মেলনের জন্য সভাঘর থাকে, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে দরগায় মানত করেন অনেকে। যেমন, ফতেপুর সিক্রির বিখ্যাত সেলিম চিস্তির দরগা, আজমের শরীফের সুফী মঈনুদ্দিন চিস্তির দরগা ইত্যাদি।

হজরতবাল দরগায় ইসলাম প্রবক্তা হজরত মহম্মদের একগাছি কেশ পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষিত আছে। হজরত মহম্মদের এক প্ৰিয় শিষ্য সৈয়দ আব্দুল্লাহ মাদানি মারফত এই কেশ এখানে আনা হয়েছিল। শোনা যায় বাদশা আওরঙজেব এই কেশ এখান থেকে জোর করে নিয়ে গিয়ে আজমের শরীফে সুফি মঈনুদ্দিন চিস্তির দরগায় রেখেছিলেন এবং পরে স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে আবার হজরতবাল দরগায় ফিরিয়ে দেন। ডাল লেকের পশ্চিম পাড়ে মুঘল এবং কাশ্মীরি স্থাপত্যের সমন্বয়ে ধবধবে সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি ‘ডোম’ হজরতবাল দরগার বৈশিষ্ট। চত্বরে ঢুকেই অনুভব করলাম কি চমৎকার শান্ত নিঃশব্দ পরিবেশ। সম্রাট শাহজাহানের আমলে এই দরগার কাজ শুরু হয়েছিল। কাজ পুরোপুরি সম্পূর্ণ হয়েছে ১৯৭৯ সালে।
আমরা বেশ কিছুক্ষণ হজরতবাল চত্বরে ঘোরাঘুরি করে গাড়িতে উঠলাম। এবার ডাল লেকে শিকারা ভ্রমণ। দুর থেকে দেখলাম, জেটিতে সারি সারি শিকারা বাঁধা আছে। মেহরাজকে রেট ঠিক করে দেওয়ার কথা বললে, সে জানায়, না এটা আমি করতে পারব না। ওরা ভাবতে পারে, আমি আপনাদের হয়ে রেট করছি, আপনারা ভাবতে পারেন, আমি ওদের কাছে কমিশন খাচ্ছি। আপনারা যান। ওখানে বোর্ডে রেট-চার্ট লাগানো আছে। দেখে নেবেন। কোনও প্রবলেম হবে না। শ্রদ্ধা বাড়লো মেহরাজের ওপর। কী স্বচ্ছ ও যথাযথ ভাবনা !

আমরা ফেরিঘাটে নেমে গেলাম। শিকারার সিটগুলো নরম গদির ওপরে ভেলভেটের কভার দিয়ে মোড়ানো আছে। মাঝখানে পাতা ঝলমলে রঙিন কার্পেট। মুখোমুখি দুটো করে সিট। বোঝাই যাচ্ছিলো শিকারাগুলো বেশ যত্নে রাখা হয়। দু-ঘন্টার চুক্তিতে আমরা চেপে বসলাম শিকারায়। টলটলে পরিষ্কার জল. তলা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। গভীরতা কোথাও ছ-সাত ফুটের বেশি নয়।
বৈঠা বাইতে বাইতে শিকারা চালক অভ্যাসবশত ধারা বিবরণীর মত বলে চলল, ওই যে ছোট দ্বীপ দেখছেন, ওটা হলো কবুতর খানা। আসলে ডাল লেক জুড়ে প্রচুর ছোট ছোট দ্বীপ। একেকটার এক একরকম নাম। যেমন গাগরিবাল দ্বীপে পন্ডিত জওহারলাল নেহেরুর স্মৃতিতে গড়া হয়েছে নেহেরু পার্ক। কবুতরখানায় ছিল মহারাজাদের গ্রীষ্মকালীন আবাস। ওখানে কবুতরদের খাবার দেওয়া হতো। ঘুরতে ঘুরতে আমরা চারচিনার দ্বীপের কাছে পৌঁছে গেলাম। চারচিনার দ্বীপের বৈশিষ্ট হলো এই দ্বীপের চার কোনায় চারটে বিশাল চিনার গাছ। সম্রাট আকবরের আমলে নাকি ওই চিনার গাছগুলো লাগানো হয়।


শিকারাচালক জানতে চাইলো, আমরা ওখানে নামতে আগ্রহী কিনা। আমরা বলে দিলাম নামবো না, পুরো দ্বীপটার চারপাশে একটা চক্কর দিতে চাই। ঠিক তখনি সাঁ করে একটা শিকারা এসে লাগলো আমাদের শিকারার গায়ে এবং এক সঙ্গে চলতে শুরু করলো। কোনও প্রশ্ন করার আগেই একজন অ্যালবাম খুলে দেখাতে শুরু করলো কাশ্মীরি পোশাক এবং গয়না পরা নানান বয়সের সুন্দর সুন্দর ছবির অ্যালবাম । সঙ্গে মুখস্ত ভাষণ। জিজ্ঞেস করলাম, এই চলন্ত অবস্থায় পোশাক পরিয়ে কিভাবে ফটো তুলবে। উত্তর হলো, চারচিনার দ্বীপে নামিয়ে, পোশাক পরিয়ে, ছবি তুলে ওরা ছেড়ে দেবে। এরপরে আমাদের লেকে ঘোরাঘুরির মধ্যেই ফটো দিয়ে দেবে। আমাদের কারওর ফটো তোলার ইচ্ছে নেই বুঝে, তিরবেগে শিকারা নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আরেকটা শিকারা এসে গেল–কাশ্মীরি গহনা, হস্তশিল্প ইত্যাদি দেখাতে শুরু করল। আমরা টুকটাক কিছু জিনিস কিনে তাকে বিদায় করতে না করতেই আরেকটা হাজির। তার কাছে কাশ্মীরি কাজ করা শাল, সালোয়ার সুট ইত্যাদি। ভাসমান বাজার দেখে বেশ মজা লাগছিলো। বোটিং এদের কাছে যেন কোনও ব্যাপারই নয়। একটা বছর দশেকের বাচ্চা কিছু সবজি নিয়ে একাই শিকারা চালিয়ে পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। ছোট বাচ্চা কোলে নিয়ে একজন বোরখা-পরা মহিলা শিকারা চালিয়ে চলে গেল পাড়ের দিকে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও বাদ নেই।

এর আগেও নানা জায়গায় বেড়াতে গিয়ে লেকে বোটিং করার অভিজ্ঞতা হয়েছে। কিন্তু ডাল লেকে শিকারা ভ্রমণ এক অনন্য অভিজ্ঞতা। ফেরার পথে দেখলাম প্রচুর ঘাস, লতানে গাছ, ফ্লোটিং প্ল্যান্টস–ডগাগুলো জলের ওপরে ভেসে আছে। শিকারা চালকের কাছে শুনলাম জুন-জুলাই মাসে নানারঙের ওয়াটার লিলি, পদ্ম এইসব জলজ ফুলে সেজে ওঠে ডাল লেক। তাছাড়াও আছে ফ্লোটিং গার্ডেন–নানারকম শাক সবজির চাষ হয়। আরেকটু এগোতেই নজরে এল বাঁশের খুঁটি পুঁতে জলের ওপরে সারি সারি সাজানো স্টল। সব পাওয়া যাচ্ছে। জামাকাপড়, শাড়ি, শাল, গয়নগাঁটি, নানান হস্তশিল্প, কার্পেট–কিছুই বাকি নেই। এমনকি ফুল-ফল-সবজিও পাওয়া যাচ্ছে।
হঠাৎ দূরে নজরে এল শংকরাচার্য পাহাড়ের চূড়া । ঘড়িতে তখন সাড়ে ছটা। দিনের আলো কমজোরি হয়ে আসছে। পশ্চিমের পড়ন্ত রোদে দুর থেকে শঙ্করাচার্য পাহাড়ের যেন অন্য রূপ। ডাল লেকের একদিকে শংকরাচার্য পাহাড়, অন্যদিকে হরি পর্বত প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে আছে। লেকের মাঝে মাঝে কিছু কিছু জায়গা কৃত্রিম ফোয়ারা দিয়ে সাজানো হয়েছে, সেগুলোও দিব্যি পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে গেছে। একরাশ খুশি নিয়ে শিকারা ভ্রমণ সমাপ্ত করে আমরা জেটিতে ফিরে এলাম। মেহরাজ কাছাকাছি অপেক্ষা করছিল। আমাদের হোটেলে পৌঁছে দিয়ে চলে যাবার আগে ওকে বলে দিলাম পরদিন ঠিক সকাল ন-টায় আমরা রওনা দেব, গন্তব্য গুলমার্গ। (চলবে)
ছবি : লেখক

