ভারতীয় বিনোদন জগতে কালো ছায়া
আবার এক নক্ষত্র পতন। চলে গেলেন সংগীতের কিংবদন্তী শিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। এক অতিমারী পুরো জগৎ-সংসার টালমাটাল করে দিল। ২০১৯-এর শেষের দিকে আমরা এর প্রকোপ সম্পর্কে প্রথম অবহিত হই। যদিও এই সংক্রমণ শুরু হয়েছে আগেই। ২০২২-এর দু’টি মাস গত প্রায়। আমরা এখনও জানি না কবে এর থেকে মুক্তি পাবো। একদিকে আমরা আপনজন হারাচ্ছি। অন্যদিকে বহু গুণীজন নাম লিখিয়েছেন মৃত্যু মিছিলে। সিনেমা, সংগীত ও অন্যান্য ক্ষেত্রের এই মানুষগুলিও আমাদের কম আপন ছিলেন না। সৃজনশীল ক্ষেত্রে নিজেদের অবদানে তাঁরা লক্ষ-কোটি মানুষের হৃদয় জুড়ে ছিলেন শ্রদ্ধা ও সমাদরে। সকলেই যে কোভিড সংক্রমণে মারা যাচ্ছেন, তা নয় ! কিন্তু কোথাও যেন একটা অমঙ্গলের বাতাস। বয়স্কদের পাশাপাশি আমরা তরুণ প্রজন্মের বহু গুণী শিল্পীকেও হারিয়েছি।
অতি সম্প্রতি আমরা হারিয়েছি ভারতীয় সংগীতের সর্বজনশ্রদ্ধেয় লতা মঙ্গেশকরকে–যিনি বেঁচে থাকতেই কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিলেন! আপামর ভারতবাসীর বিষণ্নতা আর যেন কাটছে না। বয়স হয়েছিল তাঁর। কিন্তু খুব যে অসুস্থ ছিলেন, তা নয়। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, মারণ রোগ কেড়ে নিল লতাজিকে। ২০২০-র নভেম্বরে চলে যান সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তামাম বাঙালি শোকে ভারাক্রান্ত ছিলেন বহুদিন। যেমন লতাজির শূন্যস্থান পূর্ণ হবে না। তেমন আর একজন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এ জীবনে পাবে না ভারতীয় সিনেমা। বয়স তাঁরও হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত ডিসিপ্লিন মেনে চলা মানুষটি সুস্থই ছিলেন। কাজও করছিলেন। কোভিড থামিয়ে দিল তাঁর জীবনরথ।
২০২১-এ আমরা হারাই প্রবাদপ্রতিম দিলীপ কুমারকে। হিন্দী ছবির দুনিয়ার অত্যন্ত শক্তিশালী অভিনেত্রী শশীকলাও চলে গেছেন গত বছর। তার আগে ২০২০-র সেপ্টেম্বরে এস পি বালা সুব্রাহ্মনিয়ামও মারা যান কোভিড সংক্রমণে। দক্ষিণী এই সংগীতশিল্পী বলিউডেও যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিলেন। বস্তুত, তাঁর কণ্ঠের দিওয়ানা ছিল তামাম ভারতের সংগীতরসিক জনতা। ওঁর কথাও ভোলা যাবে না। চলে গেছেন বলিউডের বিখ্যাত সংগীত পরিচালক বনরাজ ভাটিয়া, গীতিকার যোগেশ, পন্ডিত রাজন মিশ্র, পন্ডিত বিরজু মহারাজ, বাংলার প্রবাদপ্রতিম শিশু সাহিত্যিক ও কার্টুনিস্ট নারায়ণ দেবনাথ, নাট্যাবিদ ও অভিনেত্রী শাঁওলী মিত্র। এনএসডি-র প্রাক্তনী বলিউডের আর এক শক্তিশালী ও অপরিহার্য অভিনেত্রী সুরেখা সিকরিকেও হারিয়েছি আমরা গত বছর। ২০২১-এই চলে গেছেন ঋষি কাপুর। বিদায় নিয়েছেন প্রবীণ অভিনেতা ঘনশ্যাম নায়ক ওরফে ‘তারক মেহতা…’ ধারাবাহিকের নাট্টুকাকা। ওঁকেও ভুলবো না আমরা। বলিউডের কিংবদন্তী কোরিওগ্রাফার সরোজ খান চলে যান ২০২০-তে। ওই বছরেই হারিয়েছি বহু হিট ও অন্য ঘরানার ছবির পরিচালক বাসু চ্যাটার্জি।
হারিয়েছি ‘মহাভারত’ খ্যাত সতীশ কাউল, আমাদের বাংলার সুগায়ক ও অভিনেতা ভীষ্ম গুহঠাকুরতা, অভিনেতা সিদ্ধার্থ শুক্লা, বিক্রমজিৎ কানোয়ারপল ও অমিত মিস্ত্রিকে। চলে গেছেন সাজিদ-ওয়াজিদ জুটির ওয়াজিদ এবং নাদিম-শ্রাবণ জুটির শ্রাবণ। ইরফান খান বা সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর কারণ পৃথক। কিন্তু ওই যে বললাম, অমঙ্গলের ছায়া ! মহাভারত ধারাবাহিকের রাবণ অরবিন্দ ত্রিবেদী ও ভীম প্রবীণ কুমার চলে গেলেন এই মৃত্যু মিছিলে। হিন্দি টেলিভিশনের তো বেশ কয়েকজন অভিনেতাকে হারিয়েছি আমরা, যাঁদের বিদায় ঘটলো তরুণ বয়সেই। সত্যি বলতে কী, এরপর মনে রাখাই কঠিন হবে, কাদের হারালাম আমরা এই দু’তিন বছরে। অস্বীকার করা যাবে না, আগামী দিনগুলিতে বিনোদন দুনিয়ার চিত্রটি অনেকটাই বেরং হয়ে থাকবে এই মানুষগুলোর অভাবে।
