Deprecated: Function WP_Dependencies->add_data() was called with an argument that is deprecated since version 6.9.0! IE conditional comments are ignored by all supported browsers. in /home3/binodanp/public_html/wp-includes/functions.php on line 6131
কী গাইবো, কেমনে গাইবো - কী গাইবো, কেমনে গাইবো -
Saturday, March 7, 2026
তবু অনন্ত জাগে

কী গাইবো, কেমনে গাইবো

জীবনমরণের সীমানা ছাড়িয়ে ওঁরা আজ বহু আলোকবর্ষ দূরের এক জগতে। তবু আছেন ওঁরা আমাদের মাঝে। থাকবেন চিরদিন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬২ তম জন্মদিবস উদযাপিত হলো সম্প্রতি। এই উপলক্ষে আজ থেকে শুরু হলো ‘তবু অনন্ত জাগে’-র বিশেষ পর্ব। বিষয় ‘রবীন্দ্রসঙ্গীত : অনুধাবন ও পরিবেশন’। এই বিষয়ে এই সময়ের প্রখ্যাত শিল্পীদের ভাবনাসমৃদ্ধ প্রতিবেদন ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হবে।

প্রথমে তার মুখবন্ধ। লিখেছেন অজন্তা সিনহা

জন্মগত সুরেলা কন্ঠ, গাইবার জন্য প্রয়োজনীয় মেধা, যথাযথ প্রশিক্ষণ থাকলেই যে প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হওয়া যায় না, সেটা এত বছরের সঙ্গীত চর্চা ও সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা–দুটো মিলিয়েই বুঝেছি। এখানে আর একটি জরুরি কথা। শিল্পী হলেই তিনি প্রতিষ্ঠিত হবেন, এমন সবসময় হয় না। নিভৃতে সাধনরত শিল্পী কম দেখলাম না জীবনে। আবার প্রতিষ্ঠার জন্য সূক্ষ শৈল্পিক মনটাই শুধুমাত্র থাকলে চলে না। আরও অনেক কিছু রপ্ত করতে হয়। প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, অথচ শিল্পীসুলভ কোনও গুণ নেই, এমনও দেখেছি। অর্থাৎ, নতুন প্রজন্মের জন্য দিশাহারা হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। এ ক্ষেত্রে আমরা, বড়রা ওদের শুধু অভিযোগের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দায় সারতে পারি কি ? সেই ভাবনা থেকেই এই প্রতিবেদনের অবতারণা।

আমি নিজে প্রথিতযশা গুরুদের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রশিক্ষণ নিয়েছি। অমিয় বন্দোপাধ্যায়, সুবীর ভট্টাচার্য, প্রসাদ সেন, পূর্বা দাম, বন্দনা সিংহ ও অভিজিৎ বন্দোপাধ্যায়। এঁদের মধ্যে প্রবলভাবে নিভৃতচারী ছিলেন অমিয় বন্দোপাধ্যায়। তিনি নিজে সুবিনয় রায়ের ছাত্র। তেমনই পারফেকশিস্ট ছিলেন। জীবনে অত বকা আমি আর কারও কাছে খাইনি, যা মাস্টারমশাইয়ের কাছে পেয়েছি। কেঁদে ভাসিয়েছি। কিন্তু যা শিখেছি, তুলনাহীন। মীড় আর স্পর্শস্বর নিখুঁত ভাবে গাইবার জন্য এক একটি গান মাসের পর মাস শিখে গেছি। মাস্টারমশাই অসম্ভব দেখানেপনার বিপক্ষে ছিলেন। ভালো করে তৈরি না হয়ে মঞ্চে ওঠার প্রবল বিরোধী ছিলেন তিনি। আর তাঁর বিচারে এই তৈরি হওয়ার ব্যাপারটা মোটামুটি আজন্মের। মুখে যতই আমরা বলি, শেখার কোনও শেষ নাই। আমরা যারা পারফর্মিং আর্টের সঙ্গে যুক্ত, তারা কিন্তু শেখার পাশাপাশি শোনাতেও চাই। মঞ্চ, শ্রোতা, আলো, মাইক্রোফোন, হাততালি এগুলো আমাদের আকর্ষণ করে। এবার এই আকর্ষণ কার ক্ষেত্রে কতটা, সেটা ব্যাক্তি বিশেষে আলাদা হবেই।

পরবর্তীকালে যাঁদের কাছে শিখলাম, তাঁদের মধ্যে সুবীরদা খুব ফ্রেন্ডলি একজন মানুষ। আমার কলেজের ফিজিক্সের ডেমনেস্ট্রেটর ছিলেন। নিজে প্রবল সুকণ্ঠের অধিকারী। যখন গান শেখাতেন, গমগম করতো আশপাশ। একটা মুগ্ধতা ছিল। এটা বুঝেছিলাম জন্মগত ভাবে সুকণ্ঠের অধিকারী হওয়াটা জনপ্রিয়তার প্রধান ধাপ। কিন্তু, সুবীরদা আমাদের শিখিয়ে, কলেজে রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য করিয়েই খুশি থাকতেন। বহু নামী শিল্পীর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। কিন্তু নিজে খ্যাতির পিছনে ছোটেননি। খ্যাতি এবং ক্ষমতা কোনওটাই নয়। বলা বাহুল্য, আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে শিল্পীদের এই ক্ষমতার অলিন্দে থাকার সমীকরণটা আমরা আর একটু বেশি ভালো জানি।

সুবীরদা আমাকে অনেকটা দূর এগিয়ে দেন। ওঁরই সুপারিশে আমি প্রসাদ সেনের কাছে শেখার সুযোগ পাই। তারপর সেখান থেকে পূর্বাদি ও বন্দনাদি। সবশেষে অভিজিৎদা। শেষের চারজনই সঙ্গীত জগতে কিংবদন্তি। প্রত্যেকের পৃথক বৈশিষ্ট্য। সকলেই দক্ষ ও আন্তরিক। যেখানে যা শিখেছি, চিরকালীন সম্পদস্বরূপ ভান্ডারে রেখে দেওয়ার মতো। কিন্তু এই প্রশিক্ষণ আমায় পেশাদারী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাহস যোগায়নি। এর জন্য আমার নিজের দায় সবচেয়ে বেশি। পেশাদারী ভাবে গানবাজনা করবার খিদেটা অন্যরকম। সেই উচ্চাশার পরিমাপ আলাদা। সেটা তীব্রতর না হলে দুচারটে চেনা মহলে গান গেয়ে, কিছু অনুরোধের ঢেঁকি গিলে পেশাদারী শিল্পী হওয়া যায় না।

নিজের অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে এই সিরিজ শুরুর কারণ এটাই। আমি অনুভব করেছি, শুধু ভালো গেয়েই একের পর এক অনুষ্ঠানে দর্শক-শ্রোতার হৃদয় জয় করছেন বলে যখন আপনি উদ্বেলিত। তখনই দেখলেন টিকিট কেটে আপনার গান শুনতে আসার একটি লোকও নেই। আগের উল্লেখিত সবই ছিল বিনামূল্যে প্রবেশের অনুষ্ঠান। তার মানে পেশাদারী ভাবে আপনার কোনও গ্রহণযোগ্যতা নেই। রবীন্দ্রসঙ্গীতের চাহিদা বাংলাগানের বাণিজ্যিক প্রেক্ষিতে আজও শীর্ষে। এর ফলে, প্রচুর ছেলেমেয়ে এই গানকে অবলম্বন করে পেশায় আসতে চাইছে। তাদের কারও প্রশিক্ষণ আছে, অথচ পেশাদারিত্বের বাকি ব্যাকরণটা জানা নেই। অনেকেই আছে, যারা তুলনায় স্মার্ট। মঞ্চে দাঁড়িয়ে ফটাফট গেয়ে দিচ্ছে। নিজেদের ইউটিউব চ্যানেল বানিয়ে ফেলছে। ফেসবুক লাইভ করছে। কিন্তু প্রশিক্ষণ নেই। দুইয়ের মাঝামাঝিও অনেকে আছে। তাদের অন্য সমীকরণটা জানা। কাকে ধরলে, কোথায় সুযোগ পাওয়া যাবে, জেনে গেছে তারা। এরা প্রশিক্ষিত বা অপ্রশিক্ষিত–দুইই হতে পারে। তবে, এরা কিন্তু ক্ষণস্থায়ী। অর্থাৎ, সবকিছুর একটা প্যাকেজ রয়েছে। কী সেই প্যাকেজ ? প্যাকেজ না ম্যাজিক ? পরের পর্বগুলোতে আমরা সেই পথই খোঁজার চেষ্টা করবো।