Deprecated: Function WP_Dependencies->add_data() was called with an argument that is deprecated since version 6.9.0! IE conditional comments are ignored by all supported browsers. in /home3/binodanp/public_html/wp-includes/functions.php on line 6131
অপরূপ নির্জন তেন্দ্রাবং - অপরূপ নির্জন তেন্দ্রাবং -
Saturday, March 7, 2026
ঠিকানা দিকশূন্যিপুর

অপরূপ নির্জন তেন্দ্রাবং

দিন যাপনের একঘেয়েমি আর ক্লান্তি দূর করতে পর্যটনের বিকল্প নেই। চার দেওয়ালের গন্ডি ছাড়িয়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে ঝোলা কাঁধে সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন যাঁরা, তাঁদের জন্যই এই কলম। এই সপ্তাহে কালিম্পং জেলার ছোট্ট গ্রাম তেন্দ্রাবং নিয়ে লিখেছেন অজন্তা সিনহা

একটু আগেই ধূসর এক মেঘ ঢেকে দিয়েছে শরতের আকাশ। সঙ্গে কুয়াশার আস্তরণ চরাচর জুড়ে। বস্তুত, আমার এবারের পাহাড় ভ্রমণের পুরো সময়টা ধরেই প্রাধান্য পায় মেঘ আর কুয়াশা। তা হোক, পাহাড়ের মজা তো এখানেই। ঝলমলে রোদ্দুর হোক বা মেঘ কুয়াশার গাঢ় গোপন রহস্য, রূপের অতীত অরূপরসের যোগানে ঘাটতি নেই। গাড়ি কালিম্পং শহর পার হয়ে, আলগরা ছুঁয়ে একটু এগোতেই নির্জনতার ডানা যেন উড়িয়ে নিয়ে যায় কোন অচিনপুরে। চড়াই-উৎরাই গামী রাস্তার দু’পাশে প্রাচীন বিশাল গাছেদের সঘন উপস্থিতি বলে দেয়, এই তো এসে গেছি অচেনা পথে হারিয়ে যাওয়ার ঠিকানায়।

প্রথমে ছোট এক জনপদ। হোমস্টে কর্তৃপক্ষের আঞ্চলিক প্রতিনিধি শাওনজি খুব যত্ন করে তাঁর নিজের বাড়িতে বসালেন। বিজয়া চলছে। তাই জল-মিষ্টি সহকারে আপ্যায়ন। কিছুক্ষণ বসে তারপর পৌঁছলাম হোমস্টে-র মূল বাড়িটিতে। আহা, একেই তো বলে স্বর্গ। চারপাশে পাহাড়। মাঝে ছোট্ট এক মালভূমির মতো অংশ। সেখানেই ছিমছাম লালরঙের একতলা বাড়িটি দাঁড়িয়ে। আকাশ এখন তুলনায় পরিষ্কার। শেষ বিকেলের নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। বাগানের ফুলেরা মেখে নিয়েছে সেই আলো। তারপরই আমার সঙ্গে তাদের ভাবের বিনিময়। মাথা দুলিয়ে, ডাল ঝাঁকিয়ে আমায় মুহূর্তে আপন করে নেয় বর্ণালী ফুলের দল। প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে যাই কালিম্পং জেলার মিষ্টি গ্রাম তেন্দ্রাবংয়ের।

ততক্ষণে গোপাল গুরুং ইকো রিসর্ট-এ কর্মরত এলাকাবাসী তরুণ গ্যাব্রিয়েল লেপচার হাতে আমার দেখভালের দায়িত্ব তুলে দিয়ে বিদায় নিয়েছেন শাওনজি। এক্স মিলিটারিম্যান শাওনজি তাঁর বাবার নামে নির্মাণ করেছেন এই হোমস্টে। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, আপনার যা দরকার, সব ব্যবস্থা গ্যাব্রিয়েল করে দেবে। কোনও অসুবিধা হলে ফোন করবেন। অসুবিধা দূর, দুটি দিন গ্যাব্রিয়েল ও হোমস্টে-র আর এক কর্মী ছোটুর যত্নে যেভাবে কাটালাম, তা এককথায় তুলনাহীন। সেসব প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে তেন্দ্রাবংয়ে আসার প্রথম সূত্রের কথা। পর্যটন প্রসঙ্গে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ের বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে লিখতে গিয়ে এর আগেও আমি মধুমিতা মণ্ডলের কথা বলেছি। মধুমিতা ও বাপি–কলকাতার এই দম্পতি উত্তরবঙ্গে এই মুহূর্তে বেশ কয়েকটি হোমস্টে চালাচ্ছেন। তেন্দ্রাবংয়ের গোপাল গুরুং ইকো রিসর্ট তারই একটি। মূলত, ওঁদের সৌজন্যেই এই মুহূর্তে আমি পাহাড় ঘেরা এই নির্জন গ্রামের রূপসুধা পান করছি প্রাণভরে।

একটু আগেই চা আর পকোড়া দিয়ে গেছে গ্যাব্রিয়েল। রাতের রান্না ও অন্যান্য তদারকিতে ব্যস্ত সে এখন। অন্ধকারে নিজেকে আগাগোড়া মুড়ে নিয়েছে তেন্দ্রাবং। শুক্লপক্ষের চাঁদ মেঘের আড়ালে। তারারাও লুকিয়েছে মেঘের আঁচলের নিচে। ঝিঁঝিদের কনসার্ট শুরু। মাঝে মাঝে তাতে সুর মেলাচ্ছে গাছের পাতা থেকে টুপটাপ ঝরে পড়া জলের ফোটা। চা-পকোড়া আস্বাদনের অবকাশে তেন্দ্রাবং সম্পর্কে কিছু তথ্য জানানো যাক।  মাঝারি মাপের গ্রাম তেন্দ্রাবংয়ে মোটামুটি ৩০০ ঘর লোকের বসবাস। চাষবাসই বেশিরভাগ মানুষের পেশা। ডাক বিভাগ, সেনা, পুলিশ ইত্যাদি সরকারি দফতরে কর্মরত লোকজনও আছেন। তবে, শতাংশের হিসেবে নগন্য। বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন যাঁরা, তাঁদের অধিকাংশই গ্রামের বাইরে, কাছে-দূরের শহরে থাকেন। ছুটিছাটায় বাড়ি আসেন তাঁরা। এছাড়া, পর্যটন ব্যবসা তো আছেই। মোটামুটি ১৫ খানা হোমস্টে রয়েছে এখানে, এই মুহূর্তে। সকলেই অতিমারীর ধকল সামলে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে।

ডিনার খেলাম কিচেনের পাশেই তৈরি ডাইনিং রুমে। জায়গাটা বাড়ির পিছন দিকটায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘন হচ্ছে ঠাণ্ডা। গরম গরম রুটি, সবজি আর চিকেন দিয়ে ডিনার সেরে ঘরে প্রবেশ করি। আপাতত হোমস্টে-র অতিথি আমি একাই। পরিবেশ তাই একটু বেশি শান্ত। গত কয়েকদিন নাকি দারুন ভিড় ছিল। শাওনজির কথায়, এই দুদিন কোনও গেস্ট নেই। আপনার জন্য ভালোই হলো। একদম নির্ভেজাল বিশ্রাম নিন। নির্ভেজালই বটে। যাঁরা জানেন, তাঁরা জানেন, শিলিগুড়ির পথে মাঝরাতের স্তব্ধতা ছিন্নভিন্ন করে কীভাবে স্কুটার, বাইক ইত্যাদি যাতায়াত করে। লেগেই থাকে ব্যাক্তিগত ও সামাজিক উৎসব। আর সব পালনই বড় উচ্চকিত। যে কোনও শহরের মতোই শান্তির বিশ্রাম এখানে অধরা। সেই নিরিখে তেন্দ্রাবংয়ে নিশ্ছিদ্র শান্তি। হোমস্টে-র আলো ছাড়া চারপাশ অন্ধকার। ঘরের আলো নেভানো। পথ ভুলে গোটা দুই জোনাকি ঢুকে পড়েছে কখন। তাদের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়ে পড়ি। নিটোল একখানা ঘুম। আর সেই ঘুম ভাঙতেই দেখি, রোদ্দুর উঁকি দিচ্ছে জানালায়।

আজ আমার দ্বিতীয় দিন এখানে। গ্যাব্রিয়েল কোনও কাজে বাইরে গেছে। আজকের দায়িত্বে ছোটু। ছোটুর সঙ্গে সঙ্গে হাজির তার কন্যা চুকিলা, এককথায় ছোটখাটো একটি পুতুল। দারুন স্মার্ট চুকিলা। তেমনই তার সহবত জ্ঞান। আমার সামনে ব্রেকফাস্ট নিয়ে তার বাবা হাজির হতেই দূরে সরে যায় চুকিলা। আমার খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছুতেই আসে না সে। সিকিমের এক স্কুলে পড়ে চুকিলা। সেখানেই মায়ের সঙ্গে মামাবাড়িতে থাকে সে। এখন পুজোর ছুটিতে বাড়িতে এসেছে। একটু আধটু ইংরেজি, বাকি নেপালি আর আমার অতি কাঁচা হিন্দি ভাষা–তাই নিয়েই মিলিয়ে মিশিয়ে সংযোগ স্থাপন করি আমি আর চুকিলা। হৃদয়ে হৃদয় মিলে গেলে, ভাষা আর কবে অন্তরায় হয়েছে ?

চুকিলা আপাতত কাছেই তার বাড়িতে গেছে। এই অবকাশে আরও কিছু তথ্য। কেন সে সিকিমের স্কুলে পড়ে, প্রশ্নটা মনে জেগেছিল ! খবর পেলাম, তেন্দ্রাবংয়ে একটা মাত্র সরকারি প্রাইমারি স্কুল। আর রয়েছে সেন্ট মেরিজ হোম স্টাডি সেন্টার। হাইস্কুলে পড়তে হলে পেডংয়ের সেন্ট জন্স বা আলগরা সরকারি স্কুলে যেতে হয়। কলেজের জন্য কালিম্পং বা শিলিগুড়ি এবং কলকাতা।  কাছাকাছির মধ্যে, ২০১৫ সালে পেডংয়ে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্থাপিত হয়েছে গভর্নমেন্ট জেনারেল ডিগ্রি কলেজ। এলাকার তরুণ প্রজন্মের জন্য কিছুটা আশার আলো জ্বালিয়েছে যা। তবে, সে আর শতাংশে কতজনের? তেন্দ্রাবংয়ে শিক্ষার মতোই দুরাবস্থা স্বাস্থ্য পরিষেবার। একটি মাত্র সরকারি হেল্থ সেন্টার। সেখানে ডাক্তার নেই। সাধারণ সরঞ্জামও নেই সেই অর্থে। কাজ চালানোর জন্য আছেন একজন মাত্র স্বাস্থ্যকর্মী।

আজ আকাশে শরতের সাদা মেঘ। অপূর্ব সুন্দর ফুলের দল। তাদের রঙের বাহার পাগল করে দেয়। আসার পর থেকেই শুনছি জল প্রবাহের শব্দ। জানতে পারলাম, অনেকটা নিচ দিয়ে বহমান প্রাকৃতিক এক নালা এর উৎস। আমরা শহরবাসী নালা শুনলেই নাক কুঁচকে ফেলি, তার চেহারা কল্পনা করে। এখানে বিষয়টা বিপরীত। তার শরীরে বহতা প্রাকৃতিক স্বচ্ছ জল। আবহে সেই কুলুকুলু প্রবাহিনী, আকাশে সাদা-ধূসর মেঘের সঙ্গে সূর্য কিরণের দুষ্টু খেলা, বাতাসে মৃদু ঠাণ্ডা আমেজ–বড় ভালো কাটে মুহূর্তগুলি। দূরে পাহাড়ের সারি। এই বাড়িরই কোনাকুনি একটি জায়গা থেকে দুর্দান্ত কাঞ্চনজঙ্ঘার ভিউ মেলে শুনেছিলাম। তবে, আমার কাছে বেশিরভাগ সময়ের মতোই এবারেও অধরা থাকলেন তিনি।

লাঞ্চে ছিল দারুন স্বাদের ডিম কষা, বেশ অন্যরকম একটি সবজি (সবই গ্রাম-জাত এবং অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষ করা), ডাল ও পাঁপড় ভাজা ও আঁচার। সবই ছোটুর তৈরি। দুপুরে ক্ষণিক বিশ্রাম। আর সঙ্গে আরও কিছু তথ্য। গতকাল সন্ধ্যায় দারুন এক খবর জানিয়েছিল গ্যাব্রিয়েল। তেন্দ্রাবংয়ে ওরা মাছ চাষ শুরু করেছে সম্প্রতি। শুনে চমকে উঠেছিলাম। ৫০০০ ফুট ওপরে মাছ চাষ ? হ্যাঁ, কালিম্পংয়ের এই গ্রামটির উচ্চতা মোটামুটি এমনই। অর্থাৎ, আমার অবাক হওয়ারই কথা ! উজ্জ্বল মুখে গ্যাব্রিয়েল জানিয়েছিল,  আপাতত ছোট আকারে, কৃত্রিম জলাধারে। প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হলে, ভবিষ্যতে বড় আকারে ভাববে ওরা। কোভিড পরিস্থিতি গ্রামের মানুষের লড়াইকে কঠিনতর করেছে। সেটা কাটিয়ে উঠতে নানা নতুন ভাবনা–তারই একটি এই অভিনব মাছ চাষ। যেখানে ঝর্না অর্থাৎ প্রাকৃতিক জলের যোগান রয়েছে, তারই আশপাশে কৃত্রিম জলাধার নির্মাণ করে মাছ চাষ করা হচ্ছে। আপাতত গ্রাস কার্প (grass carp), আমাদের চেনা রুই মাছ একই পরিবারের অন্তর্ভূক্ত। গ্যাব্রিয়েল জানায়, ওরা ট্রাউটের (trout) চাষও করছে। পাশাপাশি চিন্তাভাবনা চলছে মাছ সরবরাহের বিষয়টি নিয়েও। বলা বাহুল্য, একটু সুষ্ঠু ব্যবস্থাসম্পন্ন বাজার খুবই দরকার এক্ষেত্রে।

একদিকে এই ইতিবাচক সংবাদ। অন্যদিকে চাষবাসের ক্ষেত্রে নানা সমস্যা লেগেই থাকে। দূষণের প্রভাব জনিত পরিবেশ এবং ভৌগলিক অবস্থানগত নানা কারণে এখানকার চাষবাস যথেষ্টই ক্ষতির মুখে। একসময় আদার ফলন ছিল ঈর্ষা করার মতো। এখন সেটা অনেক কমে গেছে। এলাচ চাষের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা। হলুদের ফলনও কমেছে। শুধু প্রাকৃতিক কারণ নয়, আর্থ-সামাজিক অবনতির কারণেও এটা হচ্ছে। যিনি কৃষি ব্যবসায়ী, তিনি ঠিকঠাক বাজার পাচ্ছেন না। কৃষকদের মজুরি দিয়ে, বাজারে মাল সরবরাহ করে তাঁর ঘরে যা ঢুকছে, তাতে ব্যবসা চালানোই দায়। আবার যিনি কৃষিশ্রমের বিনিময়ে নিজের পেট চালান, ফলন ভালো না হলে, তিনিও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও লড়ে যাচ্ছে পাহাড় গ্রামের বাসিন্দারা। চাষের ক্ষেতে ফলাচ্ছেন আলু, স্কোয়াশ, রাই শাক, গাজর, কপি, বিন, মুলো, শসা, কুমড়ো, লাউ ইত্যাদি। ফলের মধ্যে প্লাম ও আপেল। এখন আপেল চাষও ব্যাপক হারে হচ্ছে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ের বিভিন্ন অঞ্চলে। তেন্দ্রাবংয়েও রয়েছে আপেল বাগান। এছাড়া ফুলঝাড়ু গাছের চাষ, বাজারে ঝাড়ু বানিয়ে বিক্রিও বহু মানুষের জীবিকার অন্তর্গত।

বিকেল হতেই চুকিলা হাজির। সঙ্গে তার মা, পিসি। চুকিলার পিসি হোমস্টে-র ঘরদোর পরিষ্কার, বিছানা বদলানো ও ধোয়াধুয়ির কাজ করে। আন্তরিকতায় সবাই সমান প্রাণবন্ত। আলোয় সুন্দর সাজানো হয়েছে হোমস্টে। সবাই মিলে সেই ব্যাকগ্রাউন্ডে একপ্রস্থ ফটোসেশন হলো। বিকেলের শেষ থেকেই আকাশের মুখ আবার ভার। তারপর শুরু হলো ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। তারই মধ্যে জমে উঠলো গল্পগাছা। ফুল আর অর্কিডের স্বর্গ জেলা কালিম্পং। কিছু ফুলের সঙ্গে আমার দেখাসাক্ষাতের কথা আগেই বলেছি। শাওনজি গতকাল জানান, আরও ফুল আর অর্কিড দিয়ে সাজাবেন তিনি হোমস্টে। এখানে এসে অবধি আক্ষরিক অর্থেই পাখির ডাকে ঘুম ও জাগরণ ঘটেছে আমার। শুনলাম বার্ড ওয়াচাররা এই গ্রামে আসেন দূর-দূরান্ত থেকে। পাহাড়ের মতোই জঙ্গল ঘিরে রেখেছে গ্রাম। বুনো জন্তুর আবির্ভাব তাই অতি চেনা ঘটনা গ্রামের মানুষের কাছে। ভালুক, হরিণ ছাড়াও আছে লেপার্ড। লেপার্ড ভালোই উৎপাত করে, জানায় গ্যাব্রিয়েল। গ্রামে ঢুকে কুকুর, বাছুর, ছাগল ধরে নিয়ে যায়। গৃহপালিত পশুর মধ্যে গরু, ছাগল, শুয়োর–সঙ্গে মুরগি। মাছ চাষের ব্যাপারে আগেই জানিয়েছি। অর্থাৎ ভবিষ্যতে পর্যটকরা এখানে এলে শাকসবজি, চিকেন, ডিমের পাশাপাশি মাছও পাবেন।

দুর্গাপূজা পরবর্তী উৎসব মরশুম চলছে এখানেও। পুজো এবং দশেরা। কপালে টিকা লাগিয়ে, একে অপরের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করে উদযাপন। এরপর দিওয়ালি ও লোসার এবং খুব বড় করে বড়দিন যাপন। গ্রামটিতে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের বসবাস প্রধানত। রয়েছে মোট ৪টি চার্চ। একটি তো বেশ প্রাচীন। শুধু এলাকার মানুষের ধর্মপালনের জন্য নয়, পর্যটক আকর্ষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব আছে চার্চগুলির। এছাড়াও রয়েছে একটি সাইবাবার মন্দির। উৎসবের ক্ষেত্রে লেপচা সম্প্রদায়ের নাম্বুন সেলিব্রেশনের উল্লেখ করলো গ্যাব্রিয়েল। এটা তাঁদের নববর্ষ উদযাপন। লোসার যেমন বৌদ্ধদের নতুন বছর পালন উৎসব।

কাছাকাছি দেখার মধ্যে রয়েছে ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ, সিকিম বর্ডার, রংপো নদী, একটি দুর্দান্ত ঝর্না আর অবশ্যই কাঞ্চনজঙ্ঘা। এছাড়া কালিম্পং শহর খুব কাছে। সেখানকার দ্রষ্টব্যগুলির সবই দেখার সুযোগ রয়েছে। এঁরা সাইট সিয়িংয়ের ব্যবস্থাও করেন। আর যাঁরা কোত্থাও না গিয়ে নির্ভেজাল শান্তির বিশ্রাম চান, তাঁদের জন্য এককথায় অতুলনীয় তেন্দ্রাবং। মোট ৪টি ঘর আছে হোম স্টে-তে। এক একটি ঘরে ৪ জন করে থাকতে পারেন। লাঞ্চ ও ডিনারে যা পাবেন–ভাত, রুটি, সবজি, ডিম কারি, চিকেন, ভাজি, স্যালাড, পাঁপড় ও আঁচার। ব্রেকফাস্টে পুরি সবজি বা রুটি সবজি, স্ন্যাকস-এ ভেজ বা চিকেন পকোড়া। ২/৩ বার চা দেওয়া হয়। বার-বি-কিউর সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে। থাকা খাওয়ার খরচ দিন প্রতি, জন প্রতি ১৩০০ টাকা। অক্টোবর থেকে মে মাস তেন্দ্রাবং যাওয়ার জন্য উপযুক্ত সময়। তবে, মার্চ-এপ্রিলে নানা রঙ ও বৈচিত্রে ফুলের বাহারে দারুন সেজে ওঠে এই গ্রাম।

শিলিগুড়ি তেনজিং নোরগে বাসস্ট্যান্ড, নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে কালিম্পং শহর পর্যন্ত যাওয়ার প্রচুর শেয়ার গাড়ি ও সরকারি বাস রয়েছে। কালিম্পং থেকে হোমস্টে কর্তৃপক্ষ পিক আপ ও ড্রপের ব্যবস্থা করেন। খরচ প্রতি ট্রিপ ১২০০ (ছোট গাড়ি) ও ১৫০০ টাকা (বড় গাড়ি )। আজ ডিনারে চুকিলা আমার সঙ্গী হয়েছিল। ছোট ছোট হাতে কী সুন্দর রুটি ছিঁড়ে চিকেন দিয়ে খেল সে, দেখে মুগ্ধ আমি। কত ছোট বয়সে স্বনির্ভর এখানকার শিশুরা। খুব তাড়াতাড়ি লড়াই করতে শিখে যায় ওরা এভাবেই। কাল অনেক ভোরে মায়ের সঙ্গে সিকিমে যাবে সে। স্কুল খুলে গেছে। কাল আমারও যাবার পালা। রাত বাড়তেই নির্জনতা শান্তির আশ্বাস হয়ে নেমে আসে চরাচরে। জোনাকিরা আজও উড়ে বেড়ায় ঘরে। নিচে বহমান জলস্রোত যেন ঘুমপাড়ানি গান ! ঘুমের দেশে যেতে যেতে এই সব অনুষঙ্গই অন্তরের অন্দরে টেনে নিই। বিদায় তেন্দ্রাবং। ভালো থেকো। ভুলে যেও না আমায়। আগ্রহীদের জন্য যোগাযোগ : +91 72788 03993