স্মৃতিতে থেকে যায় অনিন্দ্যসুন্দর দিলওয়ারা টেম্পল
দিন যাপনের একঘেয়েমি আর ক্লান্তি দূর করতে পর্যটনের বিকল্প নেই। চার দেওয়ালের গন্ডি ছাড়িয়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে ঝোলা কাঁধে সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন যাঁরা, তাঁদের জন্যই এই কলম প্রতি সপ্তাহে। রাজস্থান ডায়েরি লিখছেন ছন্দা চট্টোপাধ্যায়। আজ পঞ্চম পর্ব।
- ৫ম দিন
পরিকল্পনা মতো স্নান ব্রেকফাস্ট সেরে সকাল নটা নাগাদ আমরা বেরিয়ে পড়লাম। উদয়পুর থেকে মাউন্ট আবুর দূরত্ব ১৬৩ কিমি। গাড়িতে সময় লাগলো ১ ঘন্টা ৪০ মিনিট। বাসে এলে সময় লেগে যেত প্রায় সাড়ে তিনঘন্টা। মাউন্ট আবুর সবচেয়ে কাছের রেল স্টেশন আবু রোড–এর দূরত্ব ২৮ কিমি। গুজরাতের বর্ডার ছুঁয়ে আছে মাউন্ট আবু। সবুজ পাহাড়ী পথে সফরের মজাই আলাদা। গভীর জঙ্গলে ঘেরা ৪০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত শৈলশহর মাউন্ট আবু গড়ে উঠেছে মূলত পার্বত্য উপত্যকায়। হোটেলে চেক-ইন করে লাঞ্চ সেরে নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমে নক্কি লেক। প্রচুর পর্যটক সমাগম সেখানে। পুরোদমে বোটিং চলছে।

লেকের ধার ঘেঁষে চলছে হর্স-রাইডিং। আমরা হর্স-রাইডিং করলাম। হাতি বা উটের পিঠে চাপার চেয়ে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হবার অভিজ্ঞতা বেশ উপভোগ্য, অদ্ভুত একটা হিরোইক ফিলিং হয়। ঘোড়াগুলোও যথেষ্ট হেলদি অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য, পুরীর সি-বীচের মত দুর্বল নয়। এরপরে চলে গেলাম মাউন্ট আবুর মূল আকর্ষণ জৈন মন্দির দিলওয়ারা টেম্পল দেখতে। অসাধারণ ক্যাম্পাস শ্বেতপাথরে খোদাই করা অনবদ্য স্থাপত্যশৈলী মুগ্ধ করে। দিলওয়ারা টেম্পল-এর পাঁচটা মন্দির নিয়ে সুসজ্জিত বিশাল ক্যাম্পাস ঘুরে দেখতে অনেকটা সময় লেগে গেল। তাড়া ছিল, সূর্যাস্তের আগে সানসেট পয়েন্টে পৌঁছতে হবে। কারণ, পরদিন লাঞ্চের পরেই আমাদের যোধপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে। সেইকারণে আমরা আগেই অবশ্য দ্রষ্টব্য স্পটগুলো নির্বাচন করে রেখেছিলাম।

আবু পাহাড়ের সর্বোচ্চ পিক গুরুশিখরের উচ্চতা ৫৬৯০ ফুট। গুরুশিখরের কাছেই সানসেট পয়েন্ট। সানসেট পয়েন্ট থেকে নিচে তাকিয়ে মনে হলো পুরো রাজস্থান চোখের সামনে। অনবদ্য ভিউ পয়েন্ট আর অসাধারণ সানসেটের সাক্ষী হতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হলো। আকাশ থেকে যেন একটা লাল বল হোলির রঙ ছড়িয়ে টুপ করে মাটির বুকে নেমে অদৃশ্য হয়ে গেল। হোটেলে ফেরার পথে ভাবছিলাম, আরাবল্লী ঝর্ণা, নদী আর সবুজের স্নেহছায়ায় কিভাবে রাজস্থানকে বাঁচিয়ে রেখেছে। হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে অল্প চা-স্ন্যাকস খেতে খেতে আড্ডা জমে উঠল। কথা হলো, পরদিন সকালে অচলেশ্বের শিবমন্দির আর নবম শতকে চৌহান রাজবংশের তৈরি অচলগড় দেখে লাঞ্চের পরে রওনা হয়ে যাব যোধপুরের উদ্দেশে।


- ৬ষ্ঠ দিন
পরের দিন সকাল সাড়ে আটটায় বেরিয়ে পড়লাম আমরা। গুরুশিখর পিকের কাছেই দুর্ভেদ্য অচলগড়ের ভগ্নাবশেষ দেখতে দেখতে ভাবছিলাম ইতিহাসও কথা বলে। গড়ের নিচে ৮১৩ শতাব্দীতে নির্মিত অচলেশ্বর শিবমন্দিরের দেবতা শিব এখানে লিঙ্গ মূর্তি নয়, পাথরের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ শিবের প্রতিভূ। পুরাণকথা অনুসারে এই বুড়ো আঙুলেই আরাবল্লীকে ধারণ করে আছেন দেবাদিদেব শিব। আরও অনেক দেবতার মূর্তিও রয়েছে মন্দিরের ভেতরে এবং চত্বর জুড়ে। অচলগড় থেকে ফিরতে ফিরতে প্রায় দুপুর বারোটা বেজে গেল। লাগেজ আগেই গুছিয়ে রাখা ছিল। লাঞ্চ সেরে গাড়িতে উঠলাম আমরা।


মাউন্ট আবু থেকে যোধপুরের দূরত্ব ২৬৩ কিমি। পাহাড় থেকে সমতলে নামার কিছুক্ষণ পর থেকেই শুরু হলো কাঁটাঝোপে ভরা রুক্ষ উষর প্রান্তরের মাঝখান দিয়ে মসৃণ পিচরাস্তায় চলা। থর মরুভূমির মধ্য দিয়ে চলতে চলতে সাড়ে ছ’টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম ব্লু-সিটি যোধপুরে। সময় লেগে গেল প্রায় সাড়ে পাঁচঘন্টা। ড্রাইভার আনন্দ আমাদের বেশ ভালোবেসে ফেলেছে মনে হলো। কারণ আমাদের যোধপুরে পৌঁছে দিয়ে ওর ফিরে যাবার কথা ছিল। কিন্তু ও আমাদের একেবারে যোধপুর এয়ারপোর্টে ড্রপ করে উদয়পুর ফিরে যাবার আগ্রহ প্রকাশ করাতে আমরাও খুব খুশি হয়ে গেলাম। প্রথম দফার রাজস্থান ট্যুরে আমাদের জয়সলমীর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় সে সাধ পূর্ণ হয়েছে। সে প্রসঙ্গ পরে। লম্বা জার্নি করে সবাই বেশ ক্লান্ত ছিলাম। হোটেলে পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে চা-টা খেয়ে বিশ্রামের জন্য যে যার ঘরে চলে গেলাম। (চলবে)
ছবি : লেখক

