Deprecated: Function WP_Dependencies->add_data() was called with an argument that is deprecated since version 6.9.0! IE conditional comments are ignored by all supported browsers. in /home3/binodanp/public_html/wp-includes/functions.php on line 6131
ইতিহাসের পায়ে পায়ে - ইতিহাসের পায়ে পায়ে -
Saturday, March 7, 2026
ঠিকানা দিকশূন্যিপুর

ইতিহাসের পায়ে পায়ে

দিন যাপনের একঘেয়েমি আর ক্লান্তি দূর করতে পর্যটনের বিকল্প নেই। চার দেওয়ালের গন্ডি ছাড়িয়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে ঝোলা কাঁধে সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন যাঁরা, তাঁদের জন্যই এই কলম। শুরু হচ্ছে নতুন ভ্রমণ ধারাবাহিক। এবার ইতিহাসের আঙিনায়। নবাবী শহর লখনউ নিয়ে লিখছেন লিপি চক্রবর্তী। আজ প্রথম পর্ব। 

ভোর সাড়ে চারটের সময় তো নামলাম লখনউ স্টেশনে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই যাঁরা নেমেছিলেন, তাঁদের প্রায় সবাই উধাও। বুঝলাম সবাই স্থানীয়। আমরাই শুধু পর্যটক। একটা অটো ধরে পৌঁছলাম আমিনাবাদ। ওখানেই একটি হোটেলে আমাদের তিনদিনের আস্তানা। হোটেলে ঢুকে বুঝলাম, একটি বিপত্তি ঘটেছে। আমাদের বুকিং বেলা বারোটা থেকে। লাউঞ্জে অপেক্ষা করতে পারতাম। কিন্তু ম্যানেজার বললেন, কিছু অর্থের বিনিময়ে একটি বাসযোগ্য ঘর দিতে পারবেন। বারোটা বাজলে আমাদের নির্দিষ্ট ঘরে চলে যেতে পারব। সেই মতো ব্যবস্থা করে ভোরের আলো একটু সজীব হতেই ম্যানেজারের হাতে আমাদের অস্থাবর সম্পত্তির ভার সঁপে দিয়ে বের হলাম টইটই করতে। মালপত্র শিফট করার দায়িত্ব রইল ম্যানেজারের কাঁধে।

একটু হাঁটাহাঁটি করে জলযোগ সারার মধ্যেই একটি গাড়ির খোঁজ পাওয়া গেল, যে আমাদের নিমিসার বা নৈমিষারণ্য নিয়ে যেতে রাজি। এই নৈমিষারণ্য নিয়ে কৌতূহল বহুদিনের। লখনউ থেকে দূরত্ব একশো কিলোমিটারের মধ্যেই। সময়টা ফেব্রুয়ারি। শহর ছাড়াতেই গাড়ির বাইরে কুয়াশা আর গাড়ির ভিতরে শীত আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক কেটে যাওয়ার পর কুয়াশার ফাঁক গলে একটি চায়ের দোকান দৃশ্যমান হলো। আমাদের সারথী জানালেন যে আমরা নিমিসার পৌঁছে গিয়েছি। তবে চেনা রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে। একটু ঘুরে ঢুকতে হবে। তাই সই!

চা সেবনান্তে আমরা পৌঁছলাম হনুমান গড়ি। পাথরের তৈরি হনুমান মূর্তিটি একটু অদ্ভুত রকমের। বিশাল চত্বর। অনেক সন্ন্যাসী থাকেন এখানে। অনেকে লাড্ডু কিনে সন্ন্যাসীদের দিচ্ছেন। ঈশ্বর নিজে তো খান না। এঁরাই ঈশ্বর। ভালো লাগল। ব্যাস গড়ি, পাণ্ডব কিলা (বনবাসকালে পাণ্ডবরা এখানে ছিল) দেখে আমরা পৌঁছলাম মূল জায়গায়, যেখানে রয়েছে চক্রতীর্থ। কথিত আছে, ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর এবং দেবী সতীর সঙ্গে এই নৈমিষারণ্য ওতপ্রোত জড়িত। তেত্রিশ দেবতার (তেত্রিশ কোটি বা প্রকার) বাসভূমিও এই নিমিসার। সেই ত্রেতা যুগ থেকে হাজার হাজার সন্ন্যাসী মোক্ষলাভের জন্য বেছে নিয়েছেন এই অরণ্যকে। 

ব্রহ্মা তাঁর চক্র গড়িয়ে দিয়েছিলেন সারা পৃথিবীকে জল সাপ্লাই দেওয়ার জন্য। একটি বিশাল গোল চক্র রয়েছে একটি বড় জলাশয়ে। এটিই চক্রতীর্থ। এখানে স্নান করলে নাকি সব রকমের পাপমুক্তি ঘটে। আর বারো বছর বাস করলে নাকি সোজা দেবলোকে পৌঁছনো যায়। আবার এও বলা হয়, দেব-অসুরে যুদ্ধের সময় এই জায়গায় এক নিমেষে অসুরদের বধ করেছিলেন দেবতারা। তাই নাম নৈমিষারণ্য, বা নিমিসার। চক্রের চারদিক ঘিরে রয়েছে অজস্র মন্দির। তার মধ্যে একটি শিব মন্দিরের প্রতি দেখলাম ভক্তরা একটু বেশি আগ্রহী। আমিও উঁকিঝুঁকি মারতে ছাড়িনি। তবে ভক্তির প্রাবল্য নয়, অন্য কৌতূহল। সেই যে এক সিনেমা তৈরি হয়েছে ‘গুমনামি বাবা’, তিনি সম্ভবত এখানে অবস্থান করেছিলেন, এই মন্দিরে। শোনা কথা, সত্য-মিথ্যে যাচাই করার ক্ষমতা আমার নেই। কৌতূহল মেটেওনি। তবু ওই উঁকিমারা স্বভাব!

ফেরার রাস্তায় ললিতা দেবীর মন্দির। একটি মিথ বলে, ব্রহ্মা ললিতা দেবীকে পাঠিয়েছিলেন নৈমিষারণ্যে, অসুর বধ করতে। দেবী সেটা সফলভাবেই সম্পন্ন করেন। অন্য মিথ বলে, শিবের তাণ্ডবকালে সতীর ছিন্ন দেহাবশেষের মধ্যে হৃৎপিণ্ডখানি নাকি এখানে পড়েছিল। সেই হিসেবে ললিতা দেবীর মন্দির সতীপিঠ। ভিড়ের প্রাবল্য এবং ভিড়ে ভর্তি রাস্তায় দণ্ডীখাটার যে অমানুষিক আচরণ দেখলাম, তা বড়ই বিচলিত করে। এটা বাদ দিলে মন্দিরটি খুব সুন্দর, পুজো দেওয়ার ধাক্কাধাক্কি নেই, লাইন টপকাবার চেষ্টাও নেই। লখনউ ফেরার রাস্তায় দেবী চন্দ্রিকার মন্দির। এই দেবীকে নাকি লক্ষ্মণের বড় ছেলে আবিষ্কার করেছিলেন। রামায়ণের যুগে একে মাহিসাগর তীর্থ বলা হত। স্কন্দ এবং কর্ম পুরাণে এর উল্লেখ আছে। প্রায় তিনশো বছরের পুরোনো মন্দির। মন্দিরের তিনদিক ঘিরে রয়েছে গোমতী নদী। বেশ খানিকটা সিঁড়ি ভাঙতে হয়। দেখলাম দেবী দুর্গার রুপোর মূর্তি। সন্ধের সময় লখনউ ফিরে এদিনের মতো অভিযান শেষ হল।

দ্বিতীয় দিন শহর লখনউ দেখতে বের হলাম, তখন প্রায় দশটা বাজে। রাজধানীর ব্যস্ততম রাস্তা দিয়ে যাওয়া। কিন্তু সেটা ব্যতিব্যস্ততায় পৌঁছল ট্রাফিকের কল্যাণে। লাল-হলুদ-সবুজ বাতি আছে। ট্রাফিক পুলিশ আছেন। পুলিশের কিয়স্ক আছে। কিন্তু ট্রাফিক আইন বলে কোনও বস্তু যে আছে, সেটা চালক থেকে আইনরক্ষক–কেউই তেমন মনে রাখেন না দেখলাম। আমাদের সারথীর কাছে এই নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করাতে, তিনি বললেন, “উও তো অপকা বঙ্গাল কা সমস্যা হ্যায়। ইধার ইয়ে সব নেহি চলতা।” ‘ইয়ে সব’ অর্থাৎ ট্রাফিক আইন ! বেঁচে থাক আমার বাংলা–মনে মনে বললাম। গাড়ির চালক আমাদের বড়া ইমামবাড়ার সামনে নামিয়ে দিলেন।

সাল ১৭৪৮। লখনউয়ের নবাব আসিফ উদ দৌল্লা এই বড়া ইমামবাড়া তৈরির কাজ শুরু করেন। ওই সময় লখনউ সহ পুরো উত্তর ভারতে ভয়াবহ খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছিল। সাধারণ মানুষের আর্থিক সমস্যা দূর করার জন্য কর্ম সংস্থানের উদ্দেশ্যে এই ইমামবাড়া তৈরি শুরু হয়। এখানেই আছে লখনউয়ের বিখ্যাত ভুলভুলাইয়া। আছে এমন এক তৎকালীন ‘সিসিটিভি’, যে নবাব দরবারে বসে মূল দরজায় কে আসছে, সেটা দেখতে পেতেন। একটি গভীর কূপের জলে দরজায় আগত সকলের ছবি ফুটে উঠত। প্রাসাদের ভিতর থেকে নবাব সব দেখতে পেতেন। 

Img 20230321 Wa0063
ইতিহাসের পায়ে পায়ে 24

কী অপূর্ব তার স্থাপত্যকলা, না দেখলে বোঝা যাবে না। বড়া ইমামবাড়ায় প্রবেশের জন্য একটি বিশাল ফটক নির্মিত হয়েছিল। যার নাম রুমি দরওয়াজা। বর্তমানে সেটির রেনভেশনের কাজ চলছে। এর উল্টোদিকে আছে শাহী হামাম, একটি বড় জলাশয়ের চারদিক ঘিরে ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গিয়েছে জলের দিকে। আছে ক্লক টাওয়ার। শাহী হামামের উল্টোদিকে পিকচার গ্যালারিতে রয়েছে তখনকার শিল্পীদের আঁকা নবাবদের ছবি, যার মধ্যে আবার বেশ কয়েকটি ‘থ্রিডি’। আর আছে ছোট ইমামবাড়া। স্থাপত্যের বিচারে এটিও কম যায় না। এখানে আছে নবাবদের স্নানঘর। তার উন্নত প্রযুক্তি এখনকার বাস্তুকারদের কাছেও ঈর্ষণীয় হতে পারে। ছোট ইমামবাড়ার পিছনে আছে ‘লখনউ চিকন’ বোনার কারখানা, যা অবশ্য দর্শনীয়। লখনউ চিকনকারী অর্থাৎ চিকনের কাজ তো জগৎ বিখ্যাত !

এখান থেকে বেরিয়ে গেলাম লখনউ চিড়িয়াখানা। চিড়িয়াখানায় অনেক জীবজন্তু তো আছেই। সেইসঙ্গে আছে তিনটি সাদা বাঘ। তারা বোধহয় মানুষ দেখে আপ্লুত হয়ে পড়ে। তাদেরই একজন ৭-৮ ফুট জায়গা জুড়ে আমাদের সামনে দিয়ে পায়চারি করছিল। অবশ্যই উঁচু লোহার রেলিংয়ের ওপারে। আর একজন দূর থেকে এসে তাকে যেন এই বলে বকা দিল– মানুষকে বেশি প্রশ্রয় দিস না ! এখানে বাঘ-সিংহ বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে, উন্মুক্ত পরিবেশে বাস করে। একটা গোটা দিন কাটাতে পারলে ভালো হতো। এত সুন্দর পরিবেশ এখানকার। চিড়িয়াখানার ভিতরে একটা খুব সুন্দর মিউজিয়ামও আছে।

Img 20230321 Wa0066
ইতিহাসের পায়ে পায়ে 25

তৃতীয় দিনটি নির্ধারিত ছিল শুধু রেসিডেন্সিতে ঘোরার জন্য। দশটা নাগাদ পৌঁছলাম রেসিডেন্সিতে। টিকিট কেটে ভিতরে পা দিতেই যেন পৌঁছে গেলাম দুশো বছর পিছনে। সৈনিক আবাস থেকে বাচ্চাদের স্কুল, গোলা বারুদের ঘর থেকে মসজিদ, কুয়ো, টার্গেট প্র্যাকটিসের জায়গা, বিভিন্ন পেশার মানুষদের বাড়ি, কামান, ইটের তৈরি জলের পাইপ–সব মিলিয়ে যেন মনে হচ্ছে অস্ত্রের ঝনঝন কিংবা কামানের গর্জন এক্ষুনি শোনা যাবে। এখানেও আছে একটি মিউজিয়াম। সেখানে নবাবদের ব্যাবহার করা বাহন (পাল্কি), পোশাক, মুদ্রা, অস্ত্র ইত্যাদি আরো কত কী আছে ! সমস্ত কিছু গুছিয়ে পরিষ্কার করে রাখা। রেসিডেন্সি থেকে বেরিয়ে একটা অটো ধরে সোজা চললাম হজরতগঞ্জ। উদ্দেশ্য মহৎ, বিরিয়ানি আর কাবাব ভুখা অন্ত্রে চালান করা। প্রসঙ্গত, আমিনাবাদেও কাবাব আর বিরিয়ানিরও তুলনা নেই।

Img 20230321 Wa0046
ইতিহাসের পায়ে পায়ে 26

◾কীভাবে যাওয়া

আকাশ পথে যেতে পারেন। স্থলপথে অর্থাৎ ট্রেনে গেলে এমন ট্রেন বাছবেন যেগুলি অন্তত সকাল গড়িয়ে দুপুরের আগে পৌঁছয়, যেমন কুম্ভ বা উপাসনা এক্সপ্রেসের সময় সব থেকে সুবিধাজনক। কারণ, হোটেলগুলোর চেক ইন বেলা বারোটায়। এছাড়া আরও অনেক ট্রেন আছে। ইন্টারনেটে পেয়ে যাবেন।

◾থাকা ও ঘোরাঘুরি 

সাধ  এবং সাধ্যের মধ্যে বহু হোটেল আছে লখনউতে। কুমায়ুন মণ্ডল বিকাশ নিগমের বাসস্থান শহরের বাইরে। নিমিসার এর জন্য গাড়ি প্রয়োজন। কিন্তু বাকিটা ঘুরতে অটো বা টোটো সুবিধাজনক। (চলবে) 

***ছবি : লেখক