ফিরে যেতে মন চায় নদীর কাছে
দিন যাপনের একঘেয়েমি আর ক্লান্তি দূর করতে পর্যটনের বিকল্প নেই। চার দেওয়ালের গন্ডি ছাড়িয়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে ঝোলা কাঁধে সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন যাঁরা, তাঁদের জন্যই এই কলম। রূপ বৈচিত্র্যে অতুলনীয় ডুয়ার্সের জয়ন্তী নিয়ে লিখেছেন অজন্তা সিনহা।
ট্রেন নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন ছেড়ে আলিপুরদুয়ার গামী রেল-ট্র্যাক ধরতেই বদলে গেল দু’পাশের দৃশ্যপট। হোমস্টে বুকিংয়ের সময় আমার ট্রাভেল এজেন্ট বলেছিলেন, এ পথের দু’ধারের সৌন্দর্য নাকি অবর্ণনীয়। তাঁর কথা দেখলাম আক্ষরিক অর্থেই সত্যি। জানালার বাইরে থেকে আর দৃষ্টি ফেরাতে পারি না। বিস্তৃত চা বাগান, ছোট ছোট গ্রাম আর অরণ্যের সবুজ বিলাস আমার নাগরিক চোখ ও মনকে শান্ত ও স্নিগ্ধ আবেশে ভরিয়ে তোলে। পাঠক বুঝতেই পারছেন, তখনও পুরোমাত্রায় উত্তরবঙ্গ-বাসী হইনি আমি। যদিও উত্তরবঙ্গে যাওয়া-আসা চলছে। ছুটি পেলেই কলকাতা ছেড়ে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ী অঞ্চল বা ডুয়ার্সে পাড়ি দিই। সেবারের গন্তব্য ছিল ডুয়ার্সের বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র জয়ন্তী। নামব আলিপুরদুয়ার জংশন স্টেশনে। ওখান থেকে গাড়িতে যাব জয়ন্তী।

রেললাইনের দু’পাশের অপরূপ সবুজ চোখে মেখে যখন আলিপুরদুয়ার জংশন স্টেশনে পৌঁছলাম, তখন বেলা গড়িয়েছে। সকালের স্নিগ্ধতা ছেড়ে আবহাওয়া কিছুটা তপ্ত। সময়টা অক্টোবর। তাই বাঁচোয়া। বাতাসের ঠান্ডা আমেজ সহজেই রোদ্দুরের ভ্রুকুটিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বেশ একটা আরামদায়ক আবহাওয়া সৃষ্টি করল একটু পরেই। স্টেশনের বাইরে বের হতে হতে টের পেলাম, পেটে ছুঁচোর দল দৌড়াদৌড়ি করছে। রিজার্ভ গাড়ি স্টেশনে এসে গিয়েছিল। ড্রাইভার ভাই বললেন, সামনেই তার চেনা খাবারের দোকান আছে। পথের ধারের সেই দোকান থেকে গরম পুরি-সবজি-চা খেয়ে রওনা দিলাম জয়ন্তীর পথে। আদতে ভারি মনোরম এক ছোট্ট গ্রাম এই জয়ন্তী। মজার ব্যাপার হলো, পাহাড়, নদী, গ্রাম–সবেরই নাম জয়ন্তী।



আলিপুরদুয়ার শহর ছাড়িয়ে প্রথম হল্ট রাজাভাতখাওয়া। এখানেই বক্সা টাইগার রিজার্ভ ফরেস্টে ঢোকার প্রবেশপথ। শান্ত, নির্জন ও নিবিড় একটি অঞ্চল। প্রবেশপথের রক্ষীদের সঙ্গে ড্রাইভার ভাই প্রয়োজনীয় আইনি কাজকর্ম সেরে নেওয়ার পরই আবার চলা শুরু। এরপর গাড়ি জঙ্গলের পথ ধরতেই আকাশ ঘন মেঘে ঢেকে গেল। আর কিছুক্ষণ পরেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু। গাড়ি তখন পুরোপুরি বনপথে, বিশাল বিশাল প্রাচীন গাছেদের মোটা মোটা ডালপালা বিপুল বেগে আন্দোলিত হচ্ছে। তারই সঙ্গে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি। আমার জীবনে পাহাড়ে বা ডুয়ার্সের বৃষ্টি দেখার সুযোগ বহুবার ঘটেছে। কিন্তু জয়ন্তী যাওয়ার পথে সেদিন জঙ্গলের মধ্যে যে ধারাপাত দেখেছিলাম, তা আগে-পরে আর কোনও দিনই দেখিনি। বৃষ্টির তোড়ে পথ ঝাপসা। ড্রাইভার কখনও গতি কমিয়ে, কখনও গাড়ি থামিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম, পথ ভাগ হয়ে গেছে দুদিকে। একটি সোজা গেছে বক্সা দুর্গের দিকে। একটি ডানদিকে, যা আমাদের নিয়ে যাবে জয়ন্তী গ্রামে। সেখানে পৌঁছনোর একটু আগে পেয়েছি জয়ন্তী নদী। সময়টা অক্টোবর, তাই তার বুক এখন পুরোপুরি শুকনো। ড্রাইভার জানায়, বর্ষায় নাকি এ নদীর জল দু’কূল ছাপিয়ে বানভাসি হয়ে ওঠে। অক্টোবরের বৃষ্টি অবশ্য নদীর বুকে সামান্য জলরেখা এঁকে দেওয়া ছাড়া আর কিছু করতে পারেনি।

হোমস্টে-র পাঁচিলঘেরা কিছুটা পাকা গাঁথনি, কিছুটা কাঠের দোতলা বাড়িটি দেখেই মন ভালো হয়ে গেল। বেশ ছিমছাম সাজানো, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। আপাতত তিনটি দিন এই বাড়িই আমার ঠিকানা। ড্রাইভার আমার মালপত্র নির্ধারিত ঘরে পৌঁছে দিয়ে চলে যায়। দোতলায় উঠেই প্রথম যে ঘর, সেটাই আমার জন্য রাখা ছিল। হোমস্টে-র একজন জানালেন লাঞ্চ রেডি। আমি ফ্রেশ হলেই সার্ভ করে দেবে। অসম্ভব ক্লান্ত আর অবসন্ন বোধ করছিলাম, যা কাটিয়ে উঠতে ধারাস্নানের প্রয়োজন দারুণভাবে অনুভব করছিলাম। অতএব সোজা বাথরুম। বাড়িটির দোতলায় তিনটি ও একতলায় তিনটি–মোট ছ’টি গেস্ট রুম। কিচেন ও ডাইনিং রুম একতলায়। সেখানেই লাঞ্চের আয়োজন। গরম ভাত, ডাল, বেগুন ভাজা আর মাছের ঝোল দিয়ে পরিপাটি আহার সেরে ঘরে ফিরলাম। ওপরে সারি সারি ঘর আর তার সামনে টানা ব্যালকনি। আমি আমার ঘরের সামনের অংশে রাখা চেয়ারে বসে সামনের খোলা প্রান্তে দৃষ্টি মেলে দিলাম। ওখানে কিছুটা গেলেই জয়ন্তী নদীর সঙ্গে দেখা হবে শুনেছি। কিন্তু এখন সেখানে যাওয়ার উপায় নেই। শরতের আকাশকে কিছুক্ষণ মেঘমুক্ত রেখে আবার কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। বৃষ্টি নামল বলে !



চোখ ভেঙে আসছিল ঘুমে। বৃষ্টি নামতেই বাতাসে হিমের পরশ থাবা বসিয়েছে। ঘরে গিয়ে বিছানায় শরীর রাখতেই গাঢ় ঘুমে তলিয়ে গেলাম। ঘুম ভাঙল দরজায় নক করার শব্দে। চা আর স্ন্যাকস নিয়ে এসেছে একজন হোমস্টে কর্মী। বাইরে গাঢ় অন্ধকার। চা খেয়ে বাইরে এসে বসি। সামনের উঁচু পাহাড়শ্রেণী প্রহরীর মতো খাড়া দাঁড়িয়ে। দিনের বেলা দেখা পাহাড়ের চেহারা এখন একেবারে অন্যরকম। অন্ধকারে তার আবছা শরীর জুড়ে পল্লবিত যেন রহস্যের মায়াজাল। আকাশ পরিষ্কার। শুক্লপক্ষের মায়াবী আলোয় চারপাশ অনির্বচনীয়। ঝিঁঝির ডাক ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। এও জানি, আগামিকাল থেকে আর নির্জনতা থাকবে না। আজ ওপরে আমি একা। নিচে দুটি পরিবার আছে। তবে, তারা বেশ শান্ত লাঞ্চের সময়ই বুঝেছিলাম। কাল একটি কলেজ পড়ুয়া দল আসবে। অর্থাৎ…! আমার অনুরোধে ডিনার ঘরেই দিয়েছিল ওরা। ইলেকট্রিক আলো থাকলেও, ভোল্টেজ কম। তাই বই সঙ্গে থাকলেও পড়ার উপায় নেই।

ঘুমোতে যাবার আগে কিছু তথ্য পাঠকের জন্য। জায়গাটি ভুটান বর্ডার। একদা ডলোমাইট মাইনের জন্য বিখ্যাত ছিল এই অঞ্চল। ডলোমাইট নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি রেলপথও ছিল। ছিল নদীর ওপর ব্রিজ। এখন সবই বিলুপ্ত ইতিহাস। শুধু কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ভগ্ন ব্রিজের একটি অংশ। এইসবই পরের দিন সকালে দেখা ও জানার সুযোগ ঘটে। যে পাহাড়শ্রেণির কথা একটু আগেই বলছিলাম, সেটি ভুটান পর্বতমালা। তবে, আঞ্চলিক ভাবে জয়ন্তী পর্বতমালাও বলা হয়। বস্তুত, ডুয়ার্সের আলিপুরদুয়ার জেলার অন্তর্গত এই ছোট্ট গ্রামটির প্রাকৃতিক অবস্থান এমন যেন প্রকৃতিরানি নিজে হাতে সাজিয়েছেন একে। বক্সা টাইগার রিজার্ভ ফরেস্ট যেমন ঘিরে রেখেছে জয়ন্তীকে। তেমনই চারপাশে ওই পর্বতশ্রেণির বেষ্টন, সঙ্গে অঞ্চল ঘিরে বহতা জয়ন্তী নদী। সব মিলিয়ে চূড়ান্ত নান্দনিক।

পরদিন ঘুম ভাঙল পাখির ডাকে। আজ একেবারে শরতের আকাশ। সূর্যদেব এখনও দর্শন দেননি। বাতাসে ঠান্ডার আমেজে আরামদায়ক আবেশ। হাত মুখ ধুয়ে বেরিয়ে পড়লাম নদীর অমোঘ টানে। হোমস্টে-র সামনের ঘাসে ঢাকা জায়গাটা পার হতেই সামনে বিস্তৃত বালির চর আর চরের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে তিরতিরে এক নদী ! সামনের পাহাড়ের অস্তিত্ব এখন আর একটু স্পষ্ট। পাদদেশের গাছপালাদের দিব্যি দেখা যাচ্ছে। যদিও এটা জানি, হাঁটতে শুরু করলে, কাছে পৌঁছতে আমার ক্ষেত্রে দিন কাবার হয়ে যাবে। অতএব চেষ্টা বৃথা। নদীর জলে হাত ডোবাই, মুখে জল বুলিয়ে নিই। আঃ, কী প্রশান্তি ! তারপর পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ভিজিয়ে পার হয়ে ওপারে যাই। পাড় বলে তো কিছু নেই, পুরোটাই বালিচর। আশপাশে একটাও মানুষ নেই। অসীম প্রকৃতির মাঝে আমি একা, যেন রবি ঠাকুরের ভাষায়–বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান…! প্রাণে এমন আকুলতা নিয়েই হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই সেই ভাঙা ব্রিজের কাছে।
কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর ফেরার পথ ধরি। ব্রেকফাস্ট করে বেরোবার কথা। কিছুটা এগিয়ে নদীর কাছে এসেই চমৎকৃত ! তিরতিরে সেই নদী এখন অনেকটা বিপুলা। জোয়ার এসেছে, তাই সে ভরপুর এখন। জল প্রায় হাঁটুর কাছে আর পা রাখতে গেলেই খরস্রোতা জয়ন্তী টেনে নিয়ে যেতে চায় কোন অচিনপুরে, কে জানে ! কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। কিছুটা দূরে একজন স্থানীয় তরুণ দাঁতন হাতে আমার কান্ড দেখছিলেন। তারপর হেসে এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে নদী পার করিয়ে দিলেন। তাঁকে সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানিয়ে যখন হোমস্টে-র গেট দিয়ে ঢুকলাম, ততক্ষণে কলেজ পড়ুয়াদের দলটা এসে পড়েছে এবং জয়ন্তীর শান্ত পরিবেশে হুল্লোড়, গোলমাল শুরু হয়ে গেছে।

বেরোবার তাড়া ছিল। তাই, সোজা ডাইনিং রুমে গিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম। গাড়ি রেডিই ছিল। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম বক্সা ফোর্টের পথে। এবার যেতে যেতে জানাব, এখানে আশপাশে কী কী দেখবেন, তার তত্ত্বতালাশ। প্রথমেই বলতে হবে মহাকাল গুহা ও মন্দিরের কথা। পর্যটক আকর্ষণ তো আছেই, এছাড়া এলাকাবাসীর কাছেও এই মন্দিরের গুরুত্ব অসীম। পুজোআচ্চার তিথি মেনে তাঁরা ভিড় জমান এখানে। বিশেষত, শিবরাত্রিতে বিপুল জন সমাগম হয়। এরপরই বলব পোখরির কথা। পোখরি অর্থাৎ পাহাড়ের ওপর ঝুলন্ত জলাশয়/পুকুর বা লেক। প্রকৃতির চরম বিস্ময় ! কিছুটা পথ গাড়িতে। পোখরিতে বাকি পথ ট্রেক করে উঠতে হয়। উঁচু-নিচু পাথর গড়ানো পথ। পোখরি স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। এখানে রয়েছে প্রচুর মাগুর মাছ আর কচ্ছপ। পর্যটকদের ছড়িয়ে দেওয়া মুড়ি দিব্যি খায় মাছেরা। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। ফ্রেশ হয়ে চা খেলাম। ক্লান্ত ছিলাম। একটু তাড়াতাড়ি ডিনার করে চললাম ঘুমের দেশে।


এখানে এলে দেখতেই হবে সিকিয়াঝোরা, যাকে ডুয়ার্সের আমাজন বলা হয়। গাড়ি করে কিছুটা গিয়ে, বাকিটা নদীতে নৌকো করে যাওয়া। আজও ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়েছি। বক্সা টাইগার রিজার্ভ ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে গেছে নদী। এতটাই ঘন জঙ্গল দু’ধারে, যে, পায়ে হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়। এদিকে নদীও এমন সরু, দুদিকের গাছ ঝুঁকে পড়ে প্রায় নৌকোর ওপর। সেইসব বাঁচিয়েই যেতে হয়। পাহাড়ের কোলে এ যেন এক জল-জঙ্গলের গল্পকথা। পর্যটকদের জন্য রোমহর্ষক এই যাত্রাপথের অভিজ্ঞতা এককথায় অবর্ণনীয়। আমি মূলত সোলো ট্রাভেলার। একাই ঘুরে বেড়াই। এই ট্রিপে নৌকাযাত্রায় একটি পরিবারের সঙ্গী হই। তাঁদের সৌজন্যেই এই প্রাপ্তি সম্ভব হয়। ফেরার সময় ঘনায়। আমার ড্রাইভার ভাই গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। তাকে সোৎসাহে জানালাম প্রায় পুরো দিনটি কতটা রোমাঞ্চকর কেটেছে ! সে জানায়, একটু আগেই হাতির একটি বড় দল পার হয়েছে সেখান দিয়ে। আমার ভাগ্যে দর্শন নেই। কী আর করা ? কিছুটা আক্ষেপ নিয়ে ফিরি হোমস্টে-তে।
পরদিন ঘুম ভাঙতেই তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে চলে যাই নদীর কাছে। আগামিকালই ফেরা। যতটুকু পারি, নদীর সঙ্গে কাটাই। শরতের আকাশ লাল করে সূর্য উঠবে একটু পরেই। আপাতত আকাশের কোণে কোণে তারই ইঙ্গিত। নদীর জলে সেই লালাভ ছায়া। নির্জন বালিচরে হাওয়া বয় শনশন। অনির্দিষ্টভাবে ঘুরে বেড়াই কিছুক্ষণ। ফেরার পথে তরুণ দলটির সঙ্গে দেখা হয়। ওরা চলেছে ভুটান পাহাড়ের দিকে। ট্রেক করে পাহাড়ে উঠবে। আমি ফিরে ব্রেকফাস্ট সেরে নিজের ঘরে আসি। এখন আলস্যে কাটাব কিছুটা সময়। সামনের বারান্দায় বসে পাহাড়ের উঁচু-নিচু চূড়াদের দেখব।


আলস্য কেটে গেল জোরদার এক গোলমালে। ছেলের দল হইহই করে ফিরছে। তাদের উত্তেজনাপূর্ণ কথা থেকে যেটা বুঝলাম, পাহাড়ের ওপরে জঙ্গলে ইতস্তত ঘুরে বেড়াবার সময় দলের একজন বাঘের দেখা পায়। তারপর কী করে বেঁচে ফিরেছে তারা, সেটাই চরম আশ্চর্যের! বাঘ বাবাজি নিজে থেকেই নাকি অকুস্থল ত্যাগ করেন। বলা বাহুল্য, সেই ছেলেটি, যে কিনা দলের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী, সে এই ঘটনায় তখনও বেশ হতচকিত (যতই সাহসী হোক)! শুনলাম এখানকার জঙ্গলে বাঘ, হাতি, বুনো ষাঁড়, হরিণ, লেপার্ড ইত্যাদি রয়েছে। বর্ষায় সাপের উপদ্রব থাকে এবং তারা বেশ বিষাক্তও। উল্টোদিকে আছে নানা জাতের পাখি ও প্রজাপতি। অরণ্যে সকলেরই যে একত্রে অবস্থান !
স্বাভাবিকভাবেই এদিন লাঞ্চে কিছুটা দেরি হয়। ফিরে একটু বিশ্রাম। এই অবকাশে জানাই আরও কিছু জরুরি তথ্য। জয়ন্তী ইকো ভিলা হোমস্টে-তে একত্রে ১৬ জন পর্যটক থাকতে পারেন, এমন ব্যবস্থা রয়েছে। হোমস্টে-র কর্ণধার মিঃ থাপা বেশ অতিথি বৎসল। ঘরগুলি পরিচ্ছন্ন ও ছিমছাম। ছয়টি ঘরের প্রত্যেকটি বাথরুমেই গিজার আছে। জানা গেল, এয়ারটেল ও ভোদা ফোনের নেটওয়ার্ক ভালো। থাকা-খাওয়া দিন-প্রতি জন-প্রতি ১০০০ টাকা (পরিবর্তন সাপেক্ষ)। এছাড়া পৃথক থাকা ও খাওয়া হিসেবেও ব্যবস্থা আছে। আগাম কথা বলে নিতে হবে। ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার ছাড়া সন্ধ্যায় স্ন্যাকস দেওয়া হয়। সকাল-সন্ধ্যা চা, এছাড়া অনুরোধে আর একবার। ব্রেকফাস্টে রুটি/পুরি/পরোটা-সবজি, লাঞ্চ ও ডিনারে ভাত/রুটি, ডাল, সবজি, ভাজা, মাছ/ডিম/চিকেন পাবেন। সব ধরনের সবজি পাওয়া যায়। মাছের তুলনায় ডিম ও চিকেন সহজলভ্য। নিকটবর্তী স্টেশন থেকে পিকআপ, ড্রপ ও সাইট সিয়িংয়ের ব্যবস্থা করেন ওঁরা। শিয়ালদহ থেকে আলিপুরদুয়ার জংশন/নিউ আলিপুরদুয়ার গামী যে কোনও ট্রেনে যেতে পারেন এখানে। বর্ষাকাল বাদ দিয়ে বছরের যে কোনও সময় যাওয়া যায়।

আজ দুপুরে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে ফেরার ট্রেন। হাতে খুব একটা সময় নেই। তবু ভোর ভোর আর একবার নদীর কাছে গেলাম। শেষবারের মতো একবার নির্জনে তাকে ছুঁয়ে দেখতেই হবে। কী সুন্দর নাম, জয়ন্তী ! মন কাঁদে বিদায়ের সুরে। নিটোল, নির্জন এই নদীর চর যেন স্বপ্নের মতো ! দূরের ওই পাহাড়ের ডাকে সাড়া দিতে পারিনি, আক্ষেপ রয়ে যায়। কিন্তু সারাদিন দেখেছি তো তাকে ! রাতে যতক্ষণ না চোখে ঘুম নেমেছে, নির্নিমেষে দেখেছি অন্ধকারে সটান দাঁড়িয়ে থাকা তার আকাশ-ছোঁয়া মূর্তি। হোমস্টে-তে ফিরে, আর্লি লাঞ্চ করে বেরিয়ে পড়লাম স্টেশনের উদ্দেশে, আরও একবার জয়ন্তীর কাছে আসার প্রবল ইচ্ছেকে সঙ্গী করে। সেই ইচ্ছে অবশ্য পূর্ণ হয়নি। হয় না। যাই হোক, পাঠকের জ্ঞাতার্থে জানাই এই হোমস্টে বুকিংয়ের জন্য যোগাযোগ : 97349 93456

