Deprecated: Function WP_Dependencies->add_data() was called with an argument that is deprecated since version 6.9.0! IE conditional comments are ignored by all supported browsers. in /home3/binodanp/public_html/wp-includes/functions.php on line 6131
কেমন আছো কাশ্মীর? - কেমন আছো কাশ্মীর? -
Saturday, March 7, 2026
ঠিকানা দিকশূন্যিপুর

কেমন আছো কাশ্মীর?

দিন যাপনের একঘেয়েমি আর ক্লান্তি দূর করতে পর্যটনের বিকল্প নেই। চার দেওয়ালের গন্ডি ছাড়িয়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে ঝোলা কাঁধে সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন যাঁরা, তাঁদের জন্যই এই কলম।

নিবিড়, নান্দনিক নিসর্গের কাশ্মীর বরাবর পর্যটন আকর্ষণের কেন্দ্রে। ভূস্বর্গ কাশ্মীর নিয়ে আমাদের যত অহংকার, তত যন্ত্রনা। স্বাধীনতার পর কেটে গেল এতগুলি বছর, বদলালো না কাশ্মীরের ভাগ্য। সুন্দর প্রকৃতির মাঝে কেমন আছেন এখানকার মানুষ ? তাঁদের যাপনও কী এমন সুন্দর ? পড়ছেন ছন্দা চট্টোপাধ্যায়ের কলমে। ধারাবাহিক রচনার নবম পর্ব আজ।

পহেলগাঁও ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা দারুন হলো, সে তো আগের সপ্তাহেই বলেছি। ঘোরাঘুরিতে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম স্বভাবতই। ফ্রেশ হয়ে চা-টা খেয়ে, কিছুক্ষণ ব্যালকনিতে বসে, ঘরে এলাম। অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করলো। সঙ্গে বৃষ্টিপাত। ইমরানের কথা অনুযায়ী এরপরেই লোডশেডিং হয়ে যাবে। ঘরে এসে মোমবাতি দেশলাই রেডি করে রাখলাম। আমরা মোমবাতি ধরানোর আগেই অবশ্য ইমরান জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে হাজির। যাই হোক, সেদিনও সাড়ে নটা নাগাদই কারেন্ট এসে গেল। আমরা রুটি-চিকেনকারি খেয়ে, ঘরে এসে  ব্যাগ গোছাতে গোছাতে কিছুক্ষণ আড্ডা দিলাম। তারপরে ঘুমের দেশে।

পাখিদের কলকাকলিতে ঘুম ভেঙে গেল ছটায়। ব্যালকনিতে গিয়ে দেখলাম ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙছে পহেলগাঁও-এর। সকালের আলোয় সম্পূর্ণ অন্যরূপে ধরা দিল প্রকৃতি। মায়াবী মিষ্টি নরম আলোয় আশ্চর্য আবেশ। স্নান ব্রেকফাস্ট সেরে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিলাম। ইমরানকে আগের দিন রাতেই বলে রেখেছিলাম লুচি আর সবজি দিয়ে প্যাকেট-লাঞ্চ বানিয়ে দিতে। ইমরান কাজকর্মে বেশ তৎপর। প্যাকেট-লাঞ্চ হাতে দিয়ে বললো, আবার দেখা হবে ম্যাডামজি। একবার যে কাশ্মীর ঘুরতে এসেছে, তাকে বারবার আসতে হয়, এত সুন্দর আমাদের কাশ্মীর।

বললাম, শুধু কাশ্মীর নয় ভাইসাব, কাশ্মীরের মানুষজনও খুব ভালো। এখানে ঘুরতে আসার আগে খুব দুশ্চিন্তা ছিল, কি হবে কে জানে! কিন্ত…মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ইমরান বলল, কিন্তু কিছুই ঘটেনি। টুরিস্ট আমাদের অতিথি। আর অতিথি হলো ভগবানের রূপ। তাঁদের সেবা করলে আমাদের মনেও শান্তি আসে। ফিরে গিয়ে চেনাজানা সবাইকে ঘুরতে আসতে বলবেন। বলবেন কোনও ভয় নেই। ইমরান লাগেজগুলো সযত্নে গাড়িতে তুলে দিল। ততক্ষণে মেহরাজও হাজির। সে পরিচিত ভঙ্গিতে ‘গুড মর্নিং’ বলে গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়ালো। ইমরানকে বিদায় জানিয়ে আমরা গাড়িতে উঠে পড়লাম।

পহেলগাঁও থেকে জম্মু যাবার পথে পড়ে পাহাড়ি শহর পাটনিটপ। অসাধারণ সৌন্দর্য। আমাদের হাতে সময় না থাকায় আমরা পাটনিটপে থাকার প্রোগ্রাম করতে পারিনি। তবে পহেলগাঁও থেকে পাটনিটপের জার্নিটাই এত চমৎকার, মন ভরে গেল। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে অজস্র ঝর্ণা। ছোটো ছোটো নদী চেনাব (চন্দ্রভাগা) নদীতে মিশেছে। পাহাড়ি জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে চন্দ্রভাগা। চেনাবের উৎপত্তি হিমাচল প্রদেশের লাহুল স্পিতি জেলার চন্দ্রতাল এবং ভাগাতাল, দুটো লেক থেকে। চন্দ্র এবং ভাগা দুই ধারা সঙ্গমের পরে চন্দ্রভাগা হয়ে জম্মু কাশ্মীরের জম্মু অঞ্চল দিয়ে বয়ে পাঞ্জাব রাজ্য বিধৌত করে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে গিয়ে সিন্ধুনদের সঙ্গে মিশেছে।

Img 20220829 Wa0049
কেমন আছো কাশ্মীর? 9

বিখ্যাত পঞ্চনদীর অন্যতম চন্দ্রভাগা। জম্মু অঞ্চলে বয়ে যাবার পথে চেনাবের ওপরে অনেকগুলো ড্যাম আছে, হাইড্রো ইলেকট্রিক প্রোজেক্ট আছে। মেহরাজ দেখালো অদুরেই নির্মিয়মান বাগলিহার ড্যাম তৈরির কাজ চলছে। একটা বড়ো ইন্ডিয়ান রেল প্রোজেক্ট–চেনাব রেলব্রিজ তৈরির কাজ প্রায় শেষের মুখে। নদীতল (রিভার বেড) থেকে ৫৬৭০ ফুট (৩৫৯মি) উচ্চতায় তৈরি এই রেলব্রিজ হলো, পৃথিবীর সর্বোচ্চ রেলব্রিজ, প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের চেয়েও ৩৫মি বেশি উঁচু। রেললাইন পাতার কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গেলে কাশ্মীর উপত্যকার সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হয়ে যাবে। কাটরা থেকে ১১১ কিমি এই রেলপথে ৩৬টা ব্রিজ এবং ২৭টা টানেল আছে।

রেলব্রিজের কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, শীতকালেও ট্রেন চলায় সমস্যা হবে না। শীতকালে বরফ জমা এবং ধস নামার কারণে মাঝে মাঝে জম্মু-কাশ্মীর সংযোগকারী ন্যাশনাল হাইওয়ে বন্ধ করে দিতে হয়। এই রেলব্রিজের কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গেলে, সেই সমস্যারও সমাধান হয়ে যাবে। অতি দুর্গম পীরপাঞ্জাল রেঞ্জের এই রেলব্রিজ আমাদের দেশের বিশেষ গৌরবের প্রতীক। প্রসঙ্গত, এই প্রজেক্টগুলির জন্যই পর্যটকদের জন্য কাশ্মীর-ভ্রমণ ক্রমশ সহজ হয়ে উঠছে। ইতিমধ্যে বানহিল বা জওহর টানেল তৈরি  হওয়ায়, সড়ক দূরত্ব ১৬ কিমি কমে গেছিল। ২০২১ সালে নতুন পীরপাঞ্জাল টানেল তৈরি হওয়ায় জম্মু-শ্রীনগর সড়ক দূরত্ব আরও ২২ কিমি কমে গেছে।

পাটনিটপ পৌঁছতে আমাদের পাঁচ ঘন্টা সময় লেগে গেল। এখান থেকে জম্মুর দূরত্ব মাত্র ৮৪ কিমি। সময় লাগবে বড়ো জোর দু’ঘন্টা। সেই কারণে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম পাটনিটপের জনপ্ৰিয় সাইট সিইং-স্পট নাথাটপে গিয়ে লাঞ্চ করে, সানাসার লেক দেখে, জম্মু চলে যাব। নাথাটপ থেকে পাটনিটপের দূরত্ব ১৯ কিমি হলেও বেশ দুর্গম রাস্তা। অসংখ্য বাঁক, প্রচুর চড়াই ভেঙে নাথাটপে পৌঁছতে আমাদের একঘন্টা লেগে গেল। চমৎকার ভিউ পয়েন্ট। পুরো হিমালয় যেন চোখের সামনে। ওখানেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকটা ঘর দেখে বেশ অবাক হলাম। ভাবলাম, এত উঁচুতেও মানুষ বাস করে ? তারপরেই চোখে পড়লো দু-তিনটে বাচ্চা পাহাড়ের ঢালে স্বচ্ছন্দে ছুটোছুটি করছে। একটু দূরে ছাগল, ভেড়া চড়ে বেড়াচ্ছে। লাঞ্চ শেষ করে আমরা চলে গেলাম ৩ কিমি দূরে সানাসার লেকের কাছে। মাঝারি মাপের লেকের ধারে মন্দির। পর্যটক সমাগম তেমন চোখে পড়লো না। একটা কাপল আর দু-তিনজন টুরিস্ট বোটিং-এ ব্যস্ত। তাছাড়া মন্দিরের পুরোহিত শ্রেণীর চার-পাঁচজন লোক দেখা গেল। জায়গাটি খুবই শান্ত আর নিরিবিলি। (চলবে)

ছবি : লেখক