Deprecated: Function WP_Dependencies->add_data() was called with an argument that is deprecated since version 6.9.0! IE conditional comments are ignored by all supported browsers. in /home3/binodanp/public_html/wp-includes/functions.php on line 6131
সবজি চাই সবজি…! - সবজি চাই সবজি…! -
Saturday, March 7, 2026
তাহাদের কথাদর্পণে জীবন

সবজি চাই সবজি…!

ঘুম ভাঙলেই ওঁদের সঙ্গে দেখা। আমাদের রোজকার জীবনে নানারূপে আছেন ওঁরা। কখনও মিষ্টি মুখে, কখনও ঝুটঝামেলায় দিনগুলি কাটে ওঁদের সঙ্গে। সেই অম্লমধুর কথকতা এই কলমে।

তখন লকডাউন-আনলকের মাঝে জীবন বহমান। জীবন আসলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হলেও চলতেই থাকে। দুপুর আর বিকেলের মাঝামাঝি একটা সময়। শুনশান পাড়া। শিলিগুড়ি শহরের বেশ কিছু পথে বাঁশের ব্যারিকেড। আমাদের গলিটা খোলাই আছে। তবু সামগ্রিকভাবে শহরের গতি নিয়ন্ত্রিত, যার প্রভাব এ পাড়াতেও। সব মিলিয়ে কেমন যেন এক খাঁ খাঁ স্তব্ধতা।

স্তব্ধতা, না শূন্যতা ??

হঠাৎ সেই শূন্য স্তব্ধতা ভেঙে আওয়াজ

ওঠে ‘সবজি-ই-ই-ই’ !!

কি আর্ততা, কি আকুলতা সেই ডাকে !

যেন অনন্তকালের হাহাকার উদ্গত সেই ডাকের মধ্যে !!

শুনে শিউরে উঠি। চোখের সামনে দেখলাম মানুষের জীবনযাপন, জীবনধারণ কঠিনতম পর্যায়ে পৌঁছে গেল। এক মারণ ভাইরাস এসে শ্রমজীবী মানুষের বেঁচে থাকাটা আরও কঠিন করে দিল। সামাজিক মেলামেশা বন্ধ করা যায়। কিন্তু পেটের ক্ষুধা যে কিছুতেই বন্দি থাকতে চায় না। পাড়ায় পাড়ায় সবজি, ফল, মাছ ইত্যাদি ফেরি করেন যাঁরা, তাঁরা তো স্বাভাবিক সময়েই বেঁচে থাকার কঠিন লড়াইয়ে সামিল। তাঁদের সেই লড়াই আজ কঠিনতর।

প্রসঙ্গত, দেশের সামগ্রিক জনসংখ্যার এক বিরাট শতাংশ এই অবস্থার শিকার হয়েছেন বারবার। বিশ্বযুদ্ধ, আকাল, মন্বন্তর, দেশভাগ সবই সইতে সইতে পথ চলেছেন তাঁরা। আজ আবার যেন সেই মর্মান্তিক ও ভয়াবহ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। ঘরে বসে সকাল থেকে শুনি সবজি বা মাছ বিক্রেতারা পথ দিয়ে হেঁকে যান। আমি আমার পাড়াতেই লক্ষ্য করেছি, আগে তিন-চারজন আসতেন সবজি-মাছ-ফল ইত্যাদি নিয়ে। এখন সেটা সংখ্যায় তিন-চার গুণ। অর্থাৎ কেউ আর এলাকা মেনে ফেরি করছেন না। কারণটা খুব সহজ। বিক্রি কমে যাওয়ায় তাঁদের খদ্দের সংখ্যা বাড়াতে হয়েছে। নতুন নতুন পাড়া খুঁজে নিতে হচ্ছে। আরও আছে। ভিন্ন ভিন্ন পেশার মানুষ চলে এসেছেন সবজি বিক্রির কাজে। অফিস ও কারখানা থেকে বিপুল হারে ছাঁটাই চলেছে। অনেকেই কাজ করছেন, কিন্তু বেতন পাচ্ছেন না। অগত্যা পেশা বদল।

২০২০-র ডিসেম্বরে বাড়ি পাল্টে এক নতুন পাড়ায় এসেছি। এখানেও নিত্য নৈমিত্তিক খাদ্য যোগানে সবজির ঠেলাই ভরসা। নতুন এক সবজিওয়ালার কাছ থেকে সবজি নেওয়া চালু হলো। কোভিড সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ আসতেই সেই চেনা মানুষটিকে আর দেখতে পাই না। রোজ আসেন ব’লে ব্যাপারটা পাড়ার লোকেরও সকলেরই চোখে পড়লো। কিন্তু কেউই কিছু জানেন না। তাঁর যোগাযোগও কারও কাছে নেই যে খোঁজ নেওয়া হবে। এরমধ্যে নতুন দু’তিনজন সবজির ঠেলা নিয়ে শূন্যস্থান পূরণে এসে গেছেন। আমরাও তাঁদের কাছেই সবজি নেওয়া শুরু করলাম বাধ্য হয়েই।

তাঁদেরই একজন–ইনি বেশ বৃদ্ধ। তবে, কমজোরি নন, খাটিয়ে। তা সত্ত্বেও সবজির ঠেলা নিয়ে রোজ পথে বের হবেন, এমন শারীরিক সক্ষম নন। কিন্তু কী অসীম মনের জোর ! একদিন খুচরো নেই–৫০০ টাকার নোট দিয়েছি। বলে গেলেন, বাড়ি ফেরার পথে দিয়ে যাবেন। দিন শেষ হয়ে যায়। আর আসেন না তিনি। পরের দু’তিনদিন যায়। আমি মনে মনে ভাবি, বিশ্বাস করে ঠকলাম ? আমার অবিশ্বাসী মনকে লজ্জা দিয়ে পাঁচদিনের দিন আসেন মানুষটি। চেহারা খুব খারাপ হয়ে গেছে। ভীষণ লজ্জিত হয়ে বললেন, “জ্বরে পড়ে গেছিলাম মা। এই যে আপনার টাকাটা।” আমি কোনও রকমে বলি, না না ঠিক আছে। কয়েকমাস যায়। হঠাৎ মানুষটি আসা বন্ধ করে দেন। মনে আশঙ্কার কালো মেঘের ঘনঘটা। আশঙ্কার জবাব মেলে না। উনিও উধাও, কোথায়, কে জানে ?

ইদানীং রোজই এক তরুণ সবজিওয়ালা এ পাড়ায় আসে। তার বাড়ি শিলিগুড়ি থেকে কিছুটা দূরের এক গ্রামে। নিত্য যাতায়াত সম্ভব নয় বলে, সে এখানেই একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে। তার ঠেলায় সবসময় টাটকা সবজি। আমি একা মানুষ, কত আর খাবো ! তবু, টাটকা সবজি দেখে ভালো লাগে–কিনে ফেলি। আপাতত এই তরুণই আমাদের পাড়ার দায়িত্বে। এক সকালে হঠাৎ কানে ভেসে আসে ওই বৃদ্ধ সবজিওয়ালার কন্ঠ। শান্তি পাই ভেবে, নাহ বেঁচে আছেন মানুষটা। কোনও কারণে পথের দিক বদলেছেন। পাশের পাড়ায় হয়তো সুবিধা হচ্ছে তাঁর।

শুধু হঠাৎ হঠাৎ কোন অতল থেকে সেই পুরোনো মানুষটির চেনা গলা ভেসে ওঠে। জানি না কেমন আছেন তিনি। সুস্থ থাকুন, এটাই প্রার্থনা। এই প্রার্থনাটুকুই করতে পারি এখন। জানি না, সে প্রার্থনা কোথাও পৌঁছয় কিনা ! তবু করি।