Deprecated: Function WP_Dependencies->add_data() was called with an argument that is deprecated since version 6.9.0! IE conditional comments are ignored by all supported browsers. in /home3/binodanp/public_html/wp-includes/functions.php on line 6131
প্রেমিক বাঙালির শ্রবণে চিরদিন থাকবেন তিনি - প্রেমিক বাঙালির শ্রবণে চিরদিন থাকবেন তিনি -
Saturday, March 7, 2026
তবু অনন্ত জাগে

প্রেমিক বাঙালির শ্রবণে চিরদিন থাকবেন তিনি

জীবনমরণের সীমানা ছাড়িয়ে ওঁরা আজ বহু আলোকবর্ষ দূরের এক জগতে। তবু আছেন ওঁরা আমাদের মাঝে। থাকবেন চিরদিন। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-সিনেমা জগতের সেইসব মানুষ, যাঁদের অবদান ছাড়া অসম্পূর্ণ আমরা, তাঁদের নিয়েই এই বিশেষ কলম প্রকাশিত হচ্ছে মাসে একবার। এবারে স্বর্ণযুগের কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী শ্যামল মিত্রকে নিয়ে লিখেছেন শ্যামলী বন্দোপাধ্যায়

বাংলার স্বর্ণযুগের কিংবদন্তি শিল্পীদের অন্যতম শ্যামল মিত্র। প্রায় ৪০ বছর ধরে বাংলা আধুনিক ও সিনেমার গানে আধিপত্য বজায় রেখেছিলেন তিনি। তাঁর কণ্ঠ ছিল অত্যন্ত সুরেলা। চূড়ান্ত আবেগ ছিল কণ্ঠের অভিব্যক্তিতে। এই কারণেই আজও বেঁচে আছেন তিনি বাংলার সংগীত রসিক থেকে একেবারে সাধারণ শ্রোতার মনে। একদিকে অভিজাত, গভীর ও গম্ভীর কণ্ঠের হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, অন্যদিকে শাস্ত্রীয় সংগীতে চূড়ান্ত দক্ষ, বিপুল কন্ঠ সম্পদের অধিকারী মান্না দে। এঁদের দুজনের জনপ্রিয়তার পাশে দাঁড়ানো ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ ! সেই চ্যালেঞ্জে উৎরেছিলেন শ্যামল মিত্র। তাঁর আদ্যন্ত রোমান্টিক গায়কী নিয়ে, মেদুর আবেগের বিধুরতা দিয়ে নিজের স্বাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এরই পাশাপাশি কম্পোজার হিসেবেও অতুলনীয় ছিলেন তিনি। বাংলা বেসিক ও সিনেমার গানে সুরকার শ্যামল ছিলেন অবিকল্প। অনেকেই হয়তো জানেন না, শ্যামল মিত্র সিনেমায় অভিনয়, এমনকী ছবি প্রযোজনাও করেছেন। 

উত্তর ২৪ পরগণার নৈহাটিতে ১৯২৯ সালের ১৪ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন শ্যামল মিত্র। তাঁর বাবা ছিলেন সে সময়ের একজন নামী ডাক্তার ও ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের ছাত্র। স্বাভাবিকভাবেই তিনি চাইতেন, তাঁর ছেলেও ডাক্তারিকেই পেশা হিসেবে বেছে নিক। কিন্তু ছেলের স্বপ্ন গায়ক হওয়ার। গানপাগল শ্যামল এক সময় সলিল চৌধুরির গণনাট্য সংঘেও যোগ দেন। গানের প্রতি তাঁর বাবার ঘোরতর আপত্তির কারণে শেষ পর্যন্ত নৈহাটির বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন কলকাতার মেসবাড়িতে। ভর্তি হলেন বঙ্গবাসী কলেজে। সে সময়ে সুধীরলাল চক্রবর্তীর গানের প্রতি শ্যামল এতটাই আকৃষ্ট হয়েছিলেন যে তাঁর কাছে গান শেখার জন্য, তাঁকে গানের ‘গুরু’ হিসেবে পাওয়ার জন্য একরকম মরিয়া হয়ে ওঠেন। অবশ্য গুরুরও সমানভাবেই ভাল লেগে যায় শিষ্যকে।

শুরু হয় সুধীরলাল চক্রবর্তীর কাছে সঙ্গীতে তালিম নেওয়া। প্রায় পাঁচ বছর সুধীরলালের কাছে গান শেখেন শ্যামল। এরপর মাত্র বাইশ বছর বয়সে সুধীরলাল চক্রবর্তীর সুরে শ্যামল মিত্রের আধুনিক গানের রেকর্ড মুক্তি পায় এইচএমভি থেকে। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সেই থেকে তাঁর গান বাঙালির পছন্দের তালিকার শীর্ষে। কী নামে ডেকে বলবো তোমাকে, নাম রেখেছি বনলতা, দূর নয় বেশি দূর, যদি কিছু আমারে সুধাও, হংসপাখা দিয়ে, ঝিরি ঝিরি বাতাস কাঁদে, যাক যাক ধুয়ে যাক মুছে যাক, এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে মন যেতে নাহি চায়, আহা ওই আঁকাবাঁকা পথ, কেন তুমি ফিরে এলে, সেদিনের সোনা ঝরা সন্ধ্যা, যদি ডাকো ওপার থেকে–এই গানগুলি একটা সময় আপামর বাঙালির হৃদয় স্পর্শ করেছিল অনায়াস আবেগে। আদতে বিরহের গানে শ্যামল ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

Images 13
প্রেমিক বাঙালির শ্রবণে চিরদিন থাকবেন তিনি 10

ছয়ের দশকের আর এক শীর্ষস্থানীয় সঙ্গীতশিল্পী ও কম্পোজার সতীনাথ মুখোপাধ্যায় শ্যামল মিত্রের গানের বিশেষ ভক্ত ছিলেন। তাঁকে দিয়ে নিজের তৈরি ‘এত আলো আর এত হাসি’ গাওয়ান, গানটি সুপারহিট হয়।  সত্যি কথা বলতে কী, ওঁর কণ্ঠের অধিকাংশ গানই সুপারহিট হয়। স্বর্ণযুগের প্রায় সব প্রথমসারির গীতিকার, সুরকারদের সৃষ্টিই কণ্ঠে প্রাণ দিয়েছেন শ্যামল। একদিকে জন্মগত প্রতিভা ও অসাধারণ সাঙ্গীতিক দক্ষতা, অন্যদিকে অভিব্যক্তি ! তাঁর সময়ের গীতিকার সুরকারদের কাছে যে বিশেষ প্রিয় হয়ে উঠবেন তিনি, সে তো বলাই বাহুল্য ! শ্যামল মিত্র যাঁদের কথা-সুরে গেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুধীরলাল চক্রবর্তী, অনুপম ঘটক, হিমাংশু দত্ত, সুবল দাশগুপ্ত, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, সুধীন দাশগুপ্ত, অভিজিৎ বন্দোপাধ্যায়, নচিকেতা ঘোষ, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, শৈলেন রায়, পবিত্র মিত্র প্রমুখ। অসংখ্য বাংলা গান, প্রায় ১০০ ছবিতে প্লেব্যাক। এরই সঙ্গে ৫০টা ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেন শ্যামল মিত্র। প্রসঙ্গত, তাঁর গাওয়া বহু হিট গানের সুরস্রষ্টা তিনি নিজেই ছিলেন।

শ্যামল মিত্র যখন বাংলা ছবিতে গান গাওয়া শুরু করেন তখন উত্তমকুমারের লিপে গান মানেই গাইবেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। কিছু গান মান্না দে। শ্যামল মিত্রের কণ্ঠ মানাবে না উত্তমকুমারের কণ্ঠে, এমন একটা ভাবনা কাজ করতো প্রথম দিকে সুরকারদের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ‘সাগরিকা’ ছবিতে উত্তমকুমারের লিপে গান গাওয়ার সুযোগ পান শ্যামল মিত্র। সৌজন্যে সে সময় বাংলা সিনেমার প্রধান সুরকারদের অন্যতম রবীন চট্টোপাধ্যায়। ১৯৫৬ সালে ‘সাগরিকা’ ছবির বিখ্যাত সেই গান হল ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে’। এই ছবির সব গানই ছিল হিট। রবীনবাবুর সুরেই ১৯৬৯ সালে মুক্তি পাওয়া ছবি ‘কমললতা’য় গাওয়া ‘ও মন কখন শুরু কখন যে শেষ কে জানে’ আজও জনপ্রিয়। যদিও প্রথমে শ্যামল মিত্রের গায়কীতে একটুও খুশি হতে পারেননি রবীনবাবু। তিনি সরাসরি বলেওছিলেন, এ গানে বাঙালির সেই আবেগ নেই। পরে শ্যামল আবার গাইলেন সেই গান। আর এমন আবেগ দিয়ে এমন সুন্দরভাবে গেয়েছিলেন যে, পরে সেটা হয়ে গেল ইতিহাস। এই গানে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে উপহারও দিয়েছিলেন রবীন চট্টোপাধ্যায়।

Images 21
প্রেমিক বাঙালির শ্রবণে চিরদিন থাকবেন তিনি 11

এছাড়া ‘দীপের নাম টিয়া রং’ ছবিতে শ্যামল মিত্রকে দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে পর্তুগীজ লোকসঙ্গীতও গাইয়েছিলেন তিনি। এরপর ১৯৬২ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত উত্তমকুমারের লিপে বেশ কিছু গান গেয়েছেন তিনি। উত্তমকুমার তাঁর চেয়ে বয়সে প্রায় তিন বছরের বড় হলেও সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতোই। উত্তমকুমারের জন্যই ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। সেই ছবিতেই ছিল বিখ্যাত গান ‘আমার এ যৌবন’–যে দৃশ্য কোনদিওনই ভোলার নয়। যদিও সিনেমায় অভিনেতা হওয়ার মতো চেহারা ছিল শ্যামলের। কোঁকড়া চুল, ভাষা ভাষা চোখ, টিকলো নাক এবং গায়ের রং, তার সঙ্গে ফ্যাশনেবল পোশাক ! নিঃসন্দেহে নজরকাড়া ব্যক্তিত্ব ছিল তাঁর। তবে, অভিনয় নয়, গানই ছিল শ্যামলের ধ্যান-জ্ঞান।

Images 22
প্রেমিক বাঙালির শ্রবণে চিরদিন থাকবেন তিনি 12

শ্যামল মিত্র প্রযোজিত ও সুরারোপিত ১৯৬৩ সালে মুক্তি পাওয়া ছবি ‘দেয়া নেয়া’ ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। উত্তমকুমার ও তনুজা অভিনীত সেই ছবি এখনও টিভিতে দেখালে, চ্যানেলের টিআরপি বেড়ে  যায়।  ‘জীবন খাতার প্রতি পাতায়’, ‘গানে ভুবন ভরিয়ে দেবে’, ‘আমি চেয়ে চেয়ে দেখি সারাদিন’, ‘মাধবী মধুপে হল মিতালি’, ‘দোলে দোদুল দোলে ঝুলনা’–প্রতিটা গান সবার মন জয় করে নেয়। সেই ছবির গল্প আসলে শ্যামল মিত্রের জীবনীনির্ভর। কথিত আছে, শ্যামলের জীবনের গল্পই চিত্রনাট্যে আনেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। তাঁর সুরে মান্না দে, কিশোর কুমার, আরতি মুখোপাধ্যায়, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় কে না গেয়েছেন ! ‘দেয়ানেয়া’ ছাড়াও ‘ভ্রান্তিবিলাস’, ‘অমানুষ’, ‘বন পলাশীর পদাবলি’, ‘আনন্দ আশ্রম’, ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’, ‘কলঙ্কিনী’ সহ বেশ কিছু ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন তিনি। ‘আনন্দ আশ্রম’ ছবিতে ‘পৃথিবী বদলে গেছে, যা দেখি নতুন লাগে’, ‘আমার স্বপ্ন তুমি ওগো চিরদিনের সাথী’, ‘আশা ছিল ভালবাসা ছিল’, এছাড়া ‘অমানুষ’ ছবির ‘কী আশায় বাঁধি খেলাঘর’ গানগুলি খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল।

‘অমানুষ’, ‘আনন্দ আশ্রম’ ছবির হিন্দি ভার্সানের গানেও তিনিই সুর দিয়েছেন। ‘আনন্দ আশ্রম’ হিন্দিতে উত্তম কুমার ও শর্মিলা ঠাকুরের লিপে কিশোর কুমার ও আশা ভোঁসলের গলায় ‘সারা পেয়ার তুমহারা’ সুপার হিট হয়। এছাড়া তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায় ‘কাজল নদীর জলে, ভরা ঢেউ ছলছলে’ কিংবা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘হয়তো কিছুই নাহি পাব’–তাঁর এই সুর চিরদিন শ্রোতার মনে গেঁথে থাকবে। তাঁর সুরে যেমন অনেক নামী শিল্পী গেয়েছেন তেমনই তিনিও  অনেক প্রখ্যাত সুরকারের সুরে গেয়েছেন, যার উল্লেখ আগেই করেছি।

Shyamal Mitra
প্রেমিক বাঙালির শ্রবণে চিরদিন থাকবেন তিনি 13

এক সময়ে শ্যামল মিত্রের মদের নেশা খুব বেড়ে যায়।  সেই সময় ‘কলঙ্কিনী’ ছবির গানের রেকর্ডিং চলছিল। একদিন এমন হলো যে, সেই রেকর্ডিং পর্যন্ত বাতিল করে দিলেন তিনি নিজেই। যদিও শেষ পর্যন্ত আশা ভোঁসলের অনুরোধে রেকর্ডিংয়ে যান। সেদিনই আবার এক বড়সড় দুর্ঘটনার মুখে পড়েন। বেশ কিছুদিন ভুগতে হয় তাঁকে। দীর্ঘদিন অসুস্থতার কারণে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। গান গাইতে পারবেন, এই আত্মবিশ্বাসও যেন হারিয়ে যেতে থাকে। ‘নিশিপদ্ম’ ছবির সেই বিখ্যাত গান ‘রাজার পঙ্খী উইড়্যা গেলে’ গাওয়ানোর জন্য বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায় একরকম কোলে করে রেকর্ডিংয়ে নিয়ে যান তাঁকে। কিন্তু এরপর থেকেই মনের সঙ্গে সঙ্গে শরীরও ভাঙতে থাকে। লিভার খারাপ হয়ে যায়। হাসপাতালে বেশ কিছুদিন লড়াই করে ১৯৮৭ সালের ১৫ নভেম্বর পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান তিনি।